বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারাচ্ছে, যা একটি প্রতিরোধযোগ্য নীরব মহামারি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে কমিউনিটিভিত্তিক শিশু যত্নকেন্দ্র (ডে-কেয়ার) ও সাঁতার শেখানোর মতো উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় বাজেটে শিশুদের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের আরও কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পরামর্শ সভায় বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
সোমবার (২৯ জুন) রাজধানীর কারওয়ান বাজারের একটি হোটেলে ‘গণমাধ্যম-নেতৃত্বাধীন অ্যাডভোকেসি’ শীর্ষক এক পরামর্শ সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে সিনারগোস। সভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিদিনের মৃত্যুর সংখ্যা ও প্রতিরোধযোগ্যতা
গবেষণায় দেখা গেছে, সাঁতার শেখার বয়স হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ জন এবং সাঁতার শেখার বয়স পর্যন্ত শিশুদের বিবেচনায় নিলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। বক্তারা বলেন, এত বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সরকারের নেওয়া প্রথম ধাপের প্রকল্পের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। একটি টেকসই রাষ্ট্র গঠনে শিশু সুরক্ষা অন্যতম পূর্বশর্ত হলেও জাতীয় বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত।
প্রকল্পের সাফল্য ও সম্প্রসারণ
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষায় পরিচালিত ‘কমিউনিটিভিত্তিক শিশু যত্নকেন্দ্র’ এবং সাঁতার শেখানোর উদ্যোগটি দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। প্রকল্পের প্রথম ধাপে দুই লাখের বেশি শিশু সেবার আওতায় এসেছে। প্রকল্পটির কার্যকারিতা বিবেচনায় দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও বৃহৎ পরিসরে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এ পর্যায়ে দেশের ৩০ জেলার ৭৯টি উপজেলায় প্রায় সাত লাখ শিশুকে সাঁতার প্রশিক্ষণ এবং তিন লাখ শিশুকে চাইল্ড কেয়ার সেন্টারের আওতায় আনা হবে। এ জন্য প্রায় ১৩ হাজার চাইল্ড কেয়ার সেন্টার এবং ২৬ হাজার কেয়ারগিভার কাজ করবেন।
রিয়েল-টাইম মনিটরিং ও টেকসই পরিকল্পনা
বিশেষজ্ঞরা জানান, এবার প্রকল্পে জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির তত্ত্বাবধানে একটি ‘রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা’ যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিটি কেন্দ্রের কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। প্রকল্পের নতুন প্রস্তাবনা ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্পটি টেকসই করতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান কমিটির সঙ্গে এর সমন্বয় করা হয়েছে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা
সমষ্টি মিডিয়ার নির্বাহী পরিচালক মীর মাসরুজ্জামান রনি এবং সিনারগোসের প্রতিনিধিরা বলেন, কয়েক বছর আগেও পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর খবর সাধারণ দুর্ঘটনার প্রতিবেদন হিসেবেই প্রকাশিত হতো। কিন্তু গণমাধ্যমের ধারাবাহিক সচেতনতা ও প্রচারের ফলে বিষয়টি এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও গুরুত্ব পাচ্ছে। পরামর্শ সভায় সিনারগোস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইশা হুসাইন, চর্চা ডটকমের সম্পাদক সোহরাব হোসেনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা বক্তব্য রাখেন।



