মাদকাসক্তি রোগ, অপরাধ নয়: বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
মাদকাসক্তি রোগ, অপরাধ নয়: বিশেষজ্ঞের মত

প্রথম আলো ট্রাস্টের আয়োজনে বিনা মূল্যে মাদকবিরোধী পরামর্শ সহায়তা সভার ১৭৮তম আসর গত ২৫ জুন ২০২৬ প্রথম আলোর কার্যালয় কারওয়ান বাজারে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পরামর্শ প্রদান করেন বিশিষ্ট শিশু-কিশোর ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল আহমেদ। ২৬ জুন আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী দিবস উপলক্ষে এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বিশ্ব মাদক সমস্যা: চলমান সংকট, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং উদ্ভাবনী ফলাফল’। অনুষ্ঠানটি সাক্ষাৎকার আকারে উপস্থাপন করা হয়।

চলমান সংকট ও নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা

ডা. হেলাল আহমেদ বলেন, মাদক সমস্যার সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রাথমিক পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। একইসঙ্গে মাদকের উৎপাদন, পরিবহন ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুরনো ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, কারণ মাদক ব্যবসায়ীরা প্রযুক্তিতে এগিয়ে গেছে। মাদকের রুট, ধরন ও গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন এসেছে। নিত্যনতুন রাসায়নিক ও উদ্ভাবনী মাদক তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জটিল শারীরিক ও মানসিক সমস্যা তৈরি করছে।

পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

কিশোর বয়সী সন্তানদের মাদক থেকে রক্ষায় কার ভূমিকা সবচেয়ে শক্তিশালী— এমন প্রশ্নে ডা. হেলাল বলেন, সরবরাহ কমাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, চিকিৎসায় চিকিৎসক এবং সচেতনতায় শিক্ষকদের ভূমিকা থাকলেও সবচেয়ে বড় ভূমিকা পরিবারের। পরিবার যদি সন্তানের সামাজিক দক্ষতা ও মানসিক বিকাশে মনোযোগ দেয়, তবে মাদকাসক্তির প্রবণতা কমে। জিপিএ-৫ বা পরীক্ষার ফলাফলের পেছনে না ছুটে সন্তানের সুস্থ মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির ব্যবহার

বর্তমানে বাবা-মা ও সন্তান উভয়েই ডিভাইসে আসক্ত। ডা. হেলাল বলেন, প্রযুক্তি সন্তানের বিকাশের সহায়ক শক্তি, তবে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তিনি বিদ্যুতের তারের উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেমন বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণের জন্য সুইচ ব্যবহার করা হয়, তেমনি প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কারণে শিশুদের ঘুমের সমস্যা, আগ্রাসী আচরণ ও রুচির বিকৃতি ঘটছে।

অভিভাবকদের জন্য চারটি পরামর্শ

ডা. হেলাল অভিভাবকদের জন্য চারটি বিজ্ঞানসম্মত পরামর্শ দেন: প্রথমত, সন্তানের ওপর জিপিএ-৫ বা পরীক্ষার ফলাফলের চাপ না দেওয়া। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে ইতিবাচক ব্যবহারে উৎসাহিত করা। তৃতীয়ত, সন্তানকে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া, যেমন সকালে কী খাবে বা কী পরবে। চতুর্থত, সন্তানকে পরনির্ভরশীল না করে কারণ বুঝিয়ে বলা— যেমন ব্যাগ নিজে গুছাতে দেওয়া এবং কোনো কিছু নিষেধ করলে কেন তা খারাপ তা যুক্তি দিয়ে বোঝানো।

চিকিৎসায় উদ্ভাবনী ফলাফল

মাদক চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্ভাবন হলো মানসিকতার পরিবর্তন। ডা. হেলাল বলেন, মাদক গ্রহণকারী অপরাধী নয়, বরং পরিস্থিতির শিকার রোগী। মাদকাসক্তি একটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও শারীরিক ব্যাধি। দ্বিতীয় উদ্ভাবন হলো সমাজভিত্তিক চিকিৎসা। রোগীকে পরিবারে রেখে, তার স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রেখে চিকিৎসা করা সম্ভব এবং এটি কার্যকর। থাইল্যান্ড ও জাপানে এই মডেল সফল। বাংলাদেশের সামাজিক ঐক্য মাদকবিরোধী লড়াইয়ে কাজে লাগানো যেতে পারে।

মাদকাসক্তি ও ডিভাইস আসক্তি: একই মস্তিষ্কের সার্কিট

ডা. হেলাল বলেন, মাদকাসক্তি ও ডিভাইস আসক্তি মস্তিষ্কের একই ‘রিওয়ার্ড সার্কিটে’ কাজ করে। পার্থক্য শুধু মাদক রাসায়নিক নির্ভর, আর ডিভাইস আসক্তি আচরণগত। উভয় ক্ষেত্রেই একই রকম আচরণ ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। তাই উভয় আসক্তিতেই সমান সহানুভূতি ও সচেতনতা প্রয়োজন।

দর্শকদের জন্য বার্তা

আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী দিবস উপলক্ষে ডা. হেলালের বার্তা: মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী না ভেবে রোগী হিসেবে বিবেচনা করুন। এটিকে সামাজিক কলঙ্ক বানাবেন না, যাতে পরিবার সত্য গোপন করে। তাকে সমাজ থেকে দূরে ঠেলে না দিয়ে বুকে টেনে নিন। ভালোবাসা ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমেই সে সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারবে।