মার্চ মাস: এন্ডোমেট্রিওসিস সচেতনতা মাস, নারীদের নীরব যন্ত্রণার কথা
মার্চ মাস: এন্ডোমেট্রিওসিস সচেতনতা ও নারী স্বাস্থ্য

মার্চ মাস: এন্ডোমেট্রিওসিস সচেতনতা মাস ও নারীদের নীরব সংগ্রাম

মার্চ মাস বিশ্বব্যাপী এন্ডোমেট্রিওসিস সচেতনতা মাস হিসেবে পালিত হচ্ছে। এই সময়ে লাখ লাখ নারী নীরবে এই ব্যথা বহন করছেন এবং চিকিৎসার অভাবে জটিলতার শিকার হচ্ছেন। অনেক কিশোরী মেয়ে প্রতি মাসের নির্দিষ্ট দিনে স্কুল বা কলেজে যেতে পারে না, কারণ ঋতুচক্রের সময় শুরু হয় অসহ্য পেটব্যথা। কারও কারও ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণও দেখা দেয়।

এন্ডোমেট্রিওসিস কী এবং কীভাবে এটি বিকশিত হয়?

এন্ডোমেট্রিওসিস হল একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেখানে জরায়ুর ভেতরের আস্তর (এন্ডোমেট্রিয়াম) মাসিকের রক্তক্ষরণের সঙ্গে বের না হয়ে উল্টো দিকে প্রবাহিত হতে পারে। এটি ফেলোপিয়ান টিউব দিয়ে জরায়ু ও আশপাশের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জমা হয়, প্রাথমিকভাবে ঘন আঠালো নিঃসরণ হিসেবে। পরে এটি আশপাশের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে একসঙ্গে জোড়া লাগায়, যাকে এডহেসন বলে। ডিম্বাশয়ে সিস্ট তৈরি হতে পারে, যা এন্ডোমেট্রিওটিক সিস্ট বা চকলেট সিস্ট নামে পরিচিত। এই তরলগুলো বের হতে না পেরে প্রদাহ তৈরি করে এবং স্থায়ী ব্যথার কারণ হয়। যখন এন্ডোমেট্রিওসিস জরায়ুতে হয়, তখন একে এডেনোমায়োসিস বলা হয়।

রোগের লক্ষণ ও প্রভাব: কেন সচেতনতা জরুরি?

এন্ডোমেট্রিওসিসের প্রাথমিক লক্ষণ হল মাসিক চলাকালে তীব্র অসহনীয় ব্যথা। এই ব্যথা বাড়তে বাড়তে একসময় নৈমিত্তিক ব্যথায় পরিণত হয়। অনেকের ক্ষেত্রে সব সময় তলপেটে ব্যথা থাকে, পায়খানা–প্রস্রাব করতে কষ্ট হয়। বিয়ের পর সহবাসে কষ্ট দেখা দিতে পারে, এবং এই রোগ থেকে বন্ধ্যত্বও হতে পারে, যা সামাজিক অপবাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রোগটি ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি, এবং এটি রিকারেন্ট ডিজিজ, অর্থাৎ একবার ভালো হয়ে আবার ফিরে আসতে পারে। এটি একটি প্রগ্রেসিভ ডিজিজ, যা ক্রমে বাড়তে থাকে এবং শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ: বিশেষজ্ঞের পরামর্শ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এন্ডোমেট্রিওসিস সম্পর্কে রোগী ও তাঁর অভিভাবকদের জানা অত্যন্ত প্রয়োজন। চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। উপসর্গ থাকলে চিকিৎসা নিতে হবে, কারণ চিকিৎসায় অবহেলা করলে জটিলতা বাড়তে পারে। নারীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা উপসর্গ লুকিয়ে না রেখে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন। এতে জটিলতা ও কষ্ট অনেকটাই লাঘব করা যায়।

ডা. শাহীনা বেগম, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা–বিশেষজ্ঞ, বিআরবি হাসপাতাল, ঢাকা, বলেন, "এন্ডোমেট্রিওসিস একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা, যা নারীদের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে। সময়মতো সচেতনতা ও চিকিৎসা নিলে এই রোগের প্রভাব কমিয়ে আনা সম্ভব।"

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও লজ্জা: কেন পরিবর্তন প্রয়োজন?

অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা এন্ডোমেট্রিওসিসের বিষয়টি জানেন ও বোঝেন, তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সামাজিক ও লোকলজ্জার ভয়ে এটি লুকিয়ে রাখা হয়। এই লজ্জা ও অজ্ঞতা রোগের জটিলতা বাড়িয়ে তোলে। তাই, সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করে এই রোগ সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা করা উচিত, যাতে নারীরা চিকিৎসা নিতে দ্বিধা না করেন।

মার্চ মাস এন্ডোমেট্রিওসিস সচেতনতা মাস হিসেবে পালনের মাধ্যমে, আমরা নারী স্বাস্থ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটি তুলে ধরতে পারি এবং সহায়তা বাড়াতে পারি।