জলবায়ু পরিবর্তন কিডনি রোগের নতুন হুমকি হিসেবে আবির্ভূত
বিশ্বজুড়ে কিডনি রোগের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর এই প্রবণতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে জলবায়ু পরিবর্তন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, তাপপ্রবাহ, পানিশূন্যতা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট কিডনি রোগের ঝুঁকিকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও কিডনি রোগ: ঝুঁকি ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এই বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
কিডনি রোগের মহামারি ও জলবায়ুর প্রভাব
বিশ্ব কিডনি দিবস-২০২৬ উপলক্ষে কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস) এই বৈঠকের আয়োজন করে। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাম্পসের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অধ্যাপক এম এ সামাদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কিডনি রোগ দ্রুতগতিতে মহামারির দিকে এগোচ্ছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, সংক্রমণ, ভেজাল খাদ্য এবং কীটনাশকের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তাপপ্রবাহ, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ পানির সংকট সরাসরি কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তাঁর উপস্থাপনায় উঠে আসে, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার রোগী ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। আরও ২৪ থেকে ৩০ হাজার রোগীর আকস্মিক কিডনি বিকল হয়ে সাময়িক ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ১৪ থেকে ২২ শতাংশ কোনো না কোনো পর্যায়ের দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগছেন।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তে থাকা তাপমাত্রা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তুলতে পারে উল্লেখ করে অধ্যাপক সামাদ বলেন, বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যে ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে এবং বাংলাদেশে গরমকাল দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা আরও ১ দশমিক ৫ থেকে ২ ডিগ্রি এবং ২১০০ সালের মধ্যে ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে তাপজনিত পানিশূন্যতা ও আকস্মিক কিডনি বিকল হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও ভারী ধাতুর দূষণ কিডনির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বন্যার সময় সংক্রমণ বৃদ্ধি এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণেও কিডনির সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সমাধানের পথ
বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক হারুন-উর-রশিদ বলেন, সারা বিশ্বে ৮৫ কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত, যার প্রধান কারণ ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ। তিনি উল্লেখ করেন, কিডনি রোগ শুরু হয় ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সে এবং ৭০ শতাংশ ক্ষতি না হলে লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তাই শুরুতেই সমস্যা ধরা পড়লে চিকিৎসায় সুস্থ হওয়ার সুযোগ আছে। তিনি আরও বলেন, কিডনি রোগীর ৭০ শতাংশের পরে ডায়ালাইসিস করে খুব বেশি লাভ হয় না, এবং বেশির ভাগ রোগী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কিডনি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে রোগীকে দীর্ঘদিন বাঁচানো সম্ভব, তবে এ জন্য সরকারি সহায়তা ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটির কাছাকাছি এবং ডায়ালাইসিস সেবার ১৫ শতাংশই ঢাকায় কেন্দ্রীভূত। তাই জেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণ এবং ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দেন তিনি।
সচেতনতা ও প্রতিরোধের আহ্বান
জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ বলেন, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও কীটনাশকের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি রাজধানীসহ প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক এনসিডিসি লাইন ডাইরেক্টর ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন কিডনি সুস্থ রাখতে খাদ্যাভাস ও জীবনাচরণে নিয়মনীতি মানার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন সচেতনতার মাধ্যমে কিডনি সমস্যা প্রতিরোধে কাজ করার আহ্বান জানান এবং শিশুসহ সব বয়সীদের খেলাধুলা ও শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগ সৃষ্টির ওপর জোর দেন। ক্যাম্পসের নির্বাহী পরিচালক রেজওয়ান সালেহীন অধিকাংশ মানুষের কিডনি সমস্যা নিয়ে অসচেতনতা উল্লেখ করে সামগ্রিক সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জোবায়দা বেগম, পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. আফরোজা বেগম, সাবেক অতিরিক্ত সচিব খোন্দকার মোস্তান হোসেন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জেনারেল সেক্রেটারি আলমগীর কবির, প্রকৃতি ও উদ্ভিদবিষয়ক লেখক মোকারম হোসেন, পরিবেশবিদ মোহাম্মদ একরামুল ইসলাম প্রমুখ।
