রাজধানীর মগবাজারের আদ্–দ্বীন হাসপাতালে ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া অসম্ভব। হাসপাতালের পোস্ট–ডেলিভারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ছয়টি নিষ্পাপ নবজাতকের প্রাণ চলে যাওয়ার ঘটনা কেবল শোকাবহ নয়, এটি আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাতে রোগীর নিরাপত্তাব্যবস্থায় চরম দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। জীবন বাঁচাতে যেখানে মানুষ হাসপাতালে যায়, সেখান থেকেই যদি সন্তানদের নিথর দেহ নিয়ে ফিরতে হয়, তবে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গা আর কোথায় অবশিষ্ট থাকে?
ঘটনার বিবরণ ও প্রাথমিক ধারণা
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বুধবার ভোরে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় ওই ওয়ার্ডে এসি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে একটি ‘শ্বাসরুদ্ধকর’ পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলো কক্ষটির এসির ভেন্টিলেশন–ব্যবস্থা এতটাই ত্রুটিপূর্ণ ছিল যে এসি বন্ধ হওয়ার পর সেখানে বাতাস চলাচলের আর কোনো বিকল্প পথ ছিল না। একটি আধুনিক বেসরকারি হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা নবজাতকদের জন্য এমন রুদ্ধদ্বার ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো থাকা কেবল কারিগরি ত্রুটি নয়, এটি সরাসরি অপরাধমূলক অবহেলা। প্রশ্ন জাগে, এই স্পর্শকাতর ওয়ার্ডগুলো কি নিয়মিত কারিগরি নিরীক্ষার (টেকনিক্যাল অডিট) মধ্য দিয়ে যায়? ভেন্টিলেশনহীন একটি কক্ষে কেন শিশুদের রাখা হলো?
তদন্ত ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজ বা এসির বিস্ফোরণ থেকে এই বিষাক্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। সরকারিভাবে তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করি, এই তদন্ত কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আদ্–দ্বীন হাসপাতালের এই ভবনের নকশা ও অগ্নিনিরাপত্তা–ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না এবং যান্ত্রিক রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা জনসমক্ষে আনা জরুরি।
আমাদের দেশে হাসপাতালের আইসিইউ বা সিসিইউতে অগ্নিকাণ্ড বা যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিক নামী হাসপাতালে এসি বা অক্সিজেন সিলিন্ডার বিস্ফোরণে রোগীর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হলেও দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির খুব একটা দেখা যায় না। দায়মুক্তির এই সংস্কৃতিই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষগুলোকে যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে উদাসীন করে তুলছে।
প্রয়োজন কঠোর স্ক্রিনিং ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বুঝতে হবে, শোক প্রকাশ বা তদন্ত কমিটি গঠনই একমাত্র সমাধান নয়। দেশের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের কারিগরি অবকাঠামো, বিশেষ করে এসি, ইলেকট্রিক লাইন এবং জরুরি ভেন্টিলেশন–ব্যবস্থার কঠোর স্ক্রিনিং প্রয়োজন। মগবাজারের এই ছয় শিশুর মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে আমাদের আধুনিক হাসপাতালগুলোর জাঁকজমকপূর্ণ দেয়ালের ভেতরে কতটা অনিরাপদ পরিবেশ লুকিয়ে আছে।
নৈতিক দায়িত্ব ও করণীয়
আমরা চাই, ৭২ ঘণ্টা পর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কেবল ‘ব্যবস্থা নেওয়া হবে’—এই আশ্বাসের বদলে দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। যারা এই অব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। সেই সঙ্গে মৃত শিশুদের শোকসন্তপ্ত বাবা-মাকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে হাসপাতালের ভেতর নিশ্বাস নিতে না পেরে শিশুদের মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।



