বডি ডিজমরফিক ডিজঅর্ডার: নিজের চেহারা ও শরীর নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তার রোগ
বডি ডিজমরফিক ডিজঅর্ডার: চেহারা ও শরীর নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তার রোগ

বডি ডিজমরফিক ডিজঅর্ডার কী?

আয়নায় তাকালেই মনে হয়—নাকটা ঠিক নেই, ত্বকের অবস্থা খারাপ, শরীরটা ভারী বা অস্বাভাবিক। মনে হয়, সবাই নিশ্চয়ই আমার শরীরের এই ত্রুটি দেখছে। কিন্তু আশপাশের মানুষ হয়তো সেসব কিছুই ভাবছে না বা খেয়াল করছে না। এ ধরনের ‘ইনসিকিউরিটি’ যখন নির্দিষ্ট মাত্রা ছাড়িয়ে ভয় ও ঘৃণায় পরিণত হয়, তখন সেটাকে বলে বডি ডিজমরফিয়া বা বডি ডিজমরফিক ডিজঅর্ডার (বিডিডি)। এই রোগে মানুষ নিজের চেহারা বা শরীর নিয়ে এমন হীনম্মন্যতায় ভোগে, যা তার স্বাভাবিক জীবনকে বাধাগ্রস্ত করে। এখানে ব্যক্তি নিজের চেহারার একটি ছোট বা প্রায় অদৃশ্য বিষয়কে খুব বড় সমস্যা মনে করে।

সম্প্রতি অনেক সেলিব্রিটিই তাঁদের বিডিডির অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন গণমাধ্যমের সামনে, যা এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে সাহায্য করছে।

বডি ডিজমরফিক ডিজঅর্ডারের সাধারণ লক্ষণ

১। চেহারা বা শরীর নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা

দিনের অনেকটা সময় কাটে নিজের চেহারার কথা ভাবতে ভাবতে। অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে করতে। নিজের আণুবিক্ষণিক ‘খুঁত’গুলো বড় করে দেখতে দেখতে। সেসব লুকানোর উপায় খুঁজতে খুঁজতে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২। বারবার আয়না দেখা বা পুরো এড়িয়ে চলা

কেউ বারবার আয়না দেখে, আবার কেউ আয়না এড়িয়ে চলে। কারণ, দেখলেই অস্বস্তি হয় তাদের।

৩। ছবি তুলতে অস্বস্তি

অনেকেই ক্যামেরা এড়িয়ে চলে। ছবি এডিট করতে থাকে। নিজের ছবিতে কেবল ‘ত্রুটি’ দেখতে পায়।

৪। সামাজিক অস্বস্তি

মনে হতে পারে, ‘সবাই তাকাচ্ছে। সবাই বিচার (জাজ) করছে। বা মানুষ নিশ্চয়ই আমার চেহারা নিয়ে ভাবছে।’ ফলে অনেকেই ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বডি ডিজমরফিক ডিজঅর্ডারের প্রভাব

নিজের চেহারা ও শরীর নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা এত তীব্র হতে পারে যে—আত্মবিশ্বাস কমে যায়, সামাজিক জীবন ব্যাহত হয়, কাজ বা পড়াশোনায় প্রভাব পড়ে, মানুষ আয়না, ছবি বা অন্যের মন্তব্য নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পড়ে, নিজের চেহারা বা শরীর আয়নায় দেখতে চায় না, আবার অনেকে আয়নার সামনে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে, নিজের চেহারা বা শরীরের ত্রুটিবিচ্যুতি নিয়ে ভাবতে থাকে, চেহারা বা শরীর দেখে অন্যে কী মনে করবে, এই চিন্তায় সামাজিক জীবন যাপন থেকে নিজেকে দূরে রাখে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব

ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা ফিল্টার্ড ছবি অনেক সময় অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ড তৈরি করে। মনে মনে নিয়মিত তুলনা করতে করতে মানুষ নিজের স্বাভাবিক চেহারাকেই ‘ভুল’ বা ‘ত্রুটিপূর্ণ’ মনে করতে শুরু করতে পারে।

কেন হয় বডি ডিজমরফিক ডিজঅর্ডার

এককভাবে সঠিক কারণ জানা না গেলেও কিছু বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন—ভুল প্যারেন্টিং বা স্কুলে বুলিং অথবা ছোটবেলার বা বড়বেলার কোনো ট্রমা থেকে নিজেকে নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগা। আত্মসম্মান কম থাকা বা ব্যক্তিত্ব সঠিকভাবে বিকশিত হতে না পারা। টক্সিক পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ। নিজেকে নিজের মতো করে গ্রহণ করতে না পারা। শিক্ষাঙ্গন বা কর্মক্ষেত্রে বডি শেমিংয়ের শিকার হওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভুল পারফেকশনিজম, নিজেকে ‘চেহারা বা শরীরসর্বস্ব’ মনে করা। উদ্বিগ্নতা, হতাশা বা অবসেসিভ চিন্তার প্রবণতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কমপারিজন কালচার।

কখন সাহায্য নেওয়া জরুরি

চেহারা বা শরীর নিয়ে চিন্তা যদি আপনার—দৈনন্দিন জীবন নষ্ট করে, সম্পর্ক, কাজ বা পড়াশোনায় সমস্যা হয়, বাইরে যেতে ভয় লাগে, চেহারার ‘ত্রুটি’ ঢাকতে অতিরিক্ত কসমেটিক প্রোডাক্ট ব্যবহার করতেই থাকেন, নিজের শরীর বা চেহারাকে ঘৃণা করেন বা এসব নিয়ে হতাশ লাগে—তাহলে মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

বডি ডিজমরফিক ডিজঅর্ডার মোকাবিলায় করণীয়

১। নিজের চিন্তাকে ‘সত্য’ ভাববেন না

আপনার মনে হওয়া প্রতিটি চিন্তাই সত্য নয়। বিডিডিতে মস্তিষ্ক অনেক সময় ত্রুটিকে বাস্তবের চেয়ে অনেক বড় করে দেখে।

২। তুলনা বন্ধ করুন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যকে দেখে নিজেকে বিচার করা বন্ধ করুন। যা দেখেন, তার সবটাই সত্য নয়। আর সত্য হলেও কী আসে যায়! আপনি আপনার মতো, সে তার মতো…এই তো!

৩। আপনি কেবল আপনার চেহারা বা শরীর নন

চেহারা ছাড়া নিজের পরিচয় তৈরি করুন। নিজেকে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য্য দিয়ে না দেখে দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব, সম্পর্ক, মূল্যবোধ—এসবকে মূল্যায়ন করুন। কেননা এসব মিলেই সত্যিকারের ‘আপনি’। চেহারা, শরীর গৌণ।

৪। আপনি যেমন, নিজেকে তেমনভাবেই গ্রহণ করুন

সুন্দর-অসুন্দর মানুষের তৈরি একটা ধারণা। সমাজ ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য, বৈষম্য করার জন্য এমন ধারণা তৈরি করে। কিন্তু সত্যটা হলো, নিজেকে নিজের মতো করে গ্রহণ করাই সুন্দর। এটা আপনাকে শক্তিশালী আর আত্মবিশ্বাসী করে।

৫। বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলুন, প্রয়োজনে পেশাদারের সাহায্য নিন

নিজের অনুভূতি ভেতরে চেপে না রেখে বিশ্বাসযোগ্য কারও সঙ্গে শেয়ার করুন। থেরাপি, বিশেষ করে সিবিটি (কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি) বিডিডি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখে। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধও প্রয়োজন হতে পারে।

একটা কথা মনে রাখবেন, আপনি আপনার চেহারা আর শরীরের চেয়ে অনেক বেশি কিছু।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে ও ভোগ