প্রতি বছর বর্ষা ও শীত মৌসুমে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লুর প্রকোপ দেখা যায়। জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা ও শরীর ব্যথার মতো উপসর্গ নিয়ে হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হন। অনেকেই সাধারণ ঠান্ডা-কাশি মনে করলেও সব ফ্লু ভাইরাস এক নয়। এর মধ্যে অন্যতম আলোচিত এবং প্রায়শই ভুল বোঝা একটি স্ট্রেন হলো এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘সোয়াইন ফ্লু’ নামে পরিচিত।
২০০৯ সালে এটি বিশ্বব্যাপী মহামারী সৃষ্টি করলেও, বর্তমানে এটি আর কোনো নতুন বা আলাদা মহামারী ভাইরাস নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এটি এখন অন্যান্য সাধারণ ফ্লুর মতোই একটি নিয়মিত মৌসুমী ভাইরাসে পরিণত হয়েছে।
লক্ষণ দেখে কি আলাদা করা সম্ভব?
সাধারণ ফ্লু এবং সোয়াইন ফ্লুর লক্ষণগুলোর মধ্যে অনেক মিল থাকায় শুধু উপসর্গ দেখে এদের আলাদা করা কঠিন। তবে চিকিৎসকদের মতে, কিছু সূক্ষ্ম ক্লিনিক্যাল পার্থক্যের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে:
- সোয়াইন ফ্লু: এতে হঠাৎ তীব্র জ্বর, তীব্র শরীর ব্যথা, প্রচণ্ড ক্লান্তি এবং শুকনো কাশি দেখা দেয়। এর একটি বিশেষ লক্ষণ হলো—আক্রান্তদের মধ্যে (বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের) বমি ও ডায়রিয়ার মতো পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
- সাধারণ ফ্লু: এতেও জ্বর ও শুকনো কাশি হয়, তবে জ্বরের তীব্রতা কিছুটা কম হতে পারে। এতে নাক বন্ধ থাকা, নাক দিয়ে পানি পড়া বা হাঁচির প্রবণতা বেশি থাকে। পেটের সমস্যা বা গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল উপসর্গ সাধারণত দেখা যায় না।
বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই পার্থক্যগুলো কেবলই সাধারণ ধারণা। ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে ভাইরাসের ধরন শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
কে বেশি ঝুঁকিতে আছেন?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হন, যার মধ্যে ৩ থেকে ৫০ লাখ মানুষের অবস্থা গুরুতর রূপ নেয়। সাধারণত সুস্থ প্রাপ্তবয়স্করা ঘরে বসে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও তরল খাবার গ্রহণের মাধ্যমেই ৩ থেকে ৭ দিনে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে কিছু শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস মারাত্মক রূপ নিতে পারে:
- ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি প্রবীণ এবং ৫ বছরের কম বয়সি শিশু।
- গর্ভবতী নারী।
- অ্যাজমা, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন মানুষ।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?
ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডক্টর অ্যালেক্স ম্যাথিউ জানান, ফ্লুর লক্ষণ দেখা দিলে বাড়িতে থাকা এবং ওষুধ ছাড়া জ্বর সম্পূর্ণ ভালো হওয়ার পর আরও অন্তত ২৪ ঘণ্টা অন্যদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা উচিত। তবে শ্বাসকষ্ট, বুকে তীব্র ব্যথা, বিভ্রান্তি বা অচেতন ভাব, শরীর নীল হয়ে যাওয়া কিংবা পানিশূন্যতার মতো ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে নিতে হবে।
প্রতিরোধের উপায়
ফ্লু থেকে বাঁচতে চিকিৎসকরা কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন:
- হাঁচি বা কাশির সময় টিস্যু বা কনুই দিয়ে মুখ-নাক ঢাকা।
- সাবান-পানি বা অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোয়া।
- অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ না করা।
- আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং অসুস্থ অবস্থায় মাস্ক ব্যবহার করা।
এছাড়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি বছর নিয়মিত ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন বা ফ্লু শট নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি



