গত প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ একটি অদ্ভুত ও রহস্যময় শব্দের সম্মুখীন হচ্ছেন—কানের ভেতর অবিরত ভনভন শব্দ। ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি এক ধরনের ‘অবিরত গুঞ্জন বা ভনভন’ শব্দ। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, যিনি এটি শুনছেন তার আশেপাশের অন্য কেউই এই শব্দ শুনতে পান না। বিশ্বজুড়ে ‘গ্লোবাল হাম’ নামে পরিচিত এই ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানের অন্যতম জটিল রহস্য হয়ে ছিল। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা এই রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে।
গবেষণায় কী বলা হয়েছে?
জার্মান সেন্টার ফর ভার্টিগো অ্যান্ড ব্যালেন্স ডিসঅর্ডার্স এবং নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই গবেষণাটি সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী পিএলওএস ওয়ান-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, ‘গ্লোবাল হাম’ আসলে বাইরের পরিবেশ থেকে আসা কোনো বাস্তব শব্দ নয়। এটি মূলত ‘লো-ফ্রিকোয়েন্সি টিনিটাস’ বা কম কম্পাঙ্কের এক ধরনের বিরল কানের রোগ হতে পারে।
সাধারণত টিনিটাস রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কানে বিভিন্ন ধরনের কাল্পনিক বা ‘ফ্যান্টম সাউন্ড’ শুনতে পান—যার মধ্যে রয়েছে ভনভন করা, গর্জন, ক্লিক বা হিসহিস শব্দ। আমেরিকার মেয়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, এটি অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা, যা বিশ্বের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মানুষকে প্রভাবিত করে। সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।
কবে থেকে শোনা যাচ্ছে এই শব্দ?
এই গুঞ্জনটি প্রথম বড় আকারে আলোচনায় আসে ১৯৭০-এর দশকে। সে সময় ব্রিটেনের ব্রিস্টল শহরের বাসিন্দারা প্রথম প্রায় ৫০ হার্টজের একটি কম কম্পাঙ্কের শব্দ শোনার কথা জানান। এর কয়েক বছর পর অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং উত্তর আমেরিকার বেশ কিছু এলাকা থেকেও একই ধরনের অভিযোগ আসতে শুরু করে। আক্রান্ত ব্যক্তিরা জানান, তারা একটানা একটি নিচু স্তরের গর্জন বা গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছেন, অথচ তাদের পাশে থাকা ব্যক্তিটি কিছুই টের পাচ্ছেন না।
গবেষণার পদ্ধতি ও ফলাফল
শব্দের উৎস খুঁজতে পরিবেশের দিকে নজর না দিয়ে গবেষকরা এবার নজর দেন ভুক্তভোগী মানুষদের ওপর। এই গবেষণার জন্য এমন ২৮ জন স্বেচ্ছাসেবীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যারা নিয়মিত এই রহস্যময় শব্দ শোনার দাবি করতেন। মূলত দুটি প্রধান সম্ভাবনা যাচাই করতে তাদের ওপর বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো হয়:
- প্রথম সম্ভাবনা: এই ব্যক্তিরা কি সাধারণ মানুষের চেয়ে কম কম্পাঙ্কের শব্দের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীল?
- দ্বিতীয় সম্ভাবনা: তারা কি তাদের কানের ভেতরেই তৈরি হওয়া কোনো শব্দ শুনছেন? যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কক্লিয়ার এমিশন’ বলা হয়। এটি মূলত মানুষের কানের ভেতর থেকে তৈরি হওয়া অত্যন্ত মৃদু একটি শব্দ, যা সাধারণ মানুষ সাধারণত টের পায় না।
গবেষণার ফলাফল বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাহ্যিক কোনো পরিবেশগত ত্রুটি নয়, বরং মানুষের শ্রবণতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ এই জটিলতাই ‘গ্লোবাল হাম’ অনুভূতির আসল কারণ।



