মেয়র-সরকার-প্রশাসক বদল হলেও রাজধানী থেকে মশা যায় না, নগরবাসীর হতাশা
মেয়র আসে মেয়র যায়, সরকার আসে সরকার যায়, প্রশাসক আসে প্রশাসক যায়— কিন্তু রাজধানী ঢাকা থেকে মশা যায় না। কোটি কোটি টাকা বাজেট হওয়া সত্ত্বেও মশা মারার কোনো কার্যকর সমাধান দেখা যাচ্ছে না। নগরবাসী মশার যন্ত্রণায় একেবারেই অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন।
নগরবাসীর আকুতি ও বাস্তবতা
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে এসে বংশালের বাসিন্দা ও শিক্ষিকা রোকসানা বেগম বাংলা ট্রিবিউনের কাছে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "মেয়র আসে মেয়র যায়, সরকার আসে সরকার যায়, প্রশাসক আসে প্রশাসক যায়— কিন্তু রাজধানী থেকে মশা যায় না।" তার এই আক্ষেপ কেবল একার নয়, বরং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রায় সব বাসিন্দার প্রতিচ্ছবি।
যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর, বংশাল, শান্তিনগর, বাড্ডা ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে মশার উপদ্রব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রোকসানা বেগমের মতো অনেক অভিভাবকের অভিযোগ, মশার কারণে শিশুরা চেয়ারে বসে ঠিকমতো পড়তে পারছে না। তিনি বলেন, "ইদানিং মশার উপদ্রব এতো বেড়েছে কয়েল জ্বালাই, স্প্রে করি তবুও কোনও লাভ হয় না। মশা মরে না। অল্প কিছু মরলেও আবার কোত্থেকে যেন চলে আসে। আগে তো মাঝেমধ্যে মশার ওষুধ দিতো, এখন তা-ও বন্ধ।"
পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান জানান, নির্বাচনের সপ্তাহ খানেক আগে তার আট বছরের শিশু ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চারদিন হাসপাতালে ছিল। তিনি বলেন, "রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টা খাটে মশারি টাঙিয়ে রাখি। এমনকি মশারির ভেতরেই বাচ্চাদের পড়াশুনা করাই।" অভিযোগ করে তিনি বলেন, "আগে কাউন্সিলর ছিল, অভিযোগ করতে পারতাম। এখন প্রশাসক থাকায় তদারকি দুর্বল হয়ে পড়েছে। আটতলার ওপরেও মশা ভনভন করে।" এরপর আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, "গত তিন মাসে ঠিকমত তিন দিনও মশক নিধনের ওষুধ দেওয়া হয়নি। তাছাড়া এই ওষুধ দিলেও কোনও লাভ হয় না।"
তদারকির অভাব ও ময়লার স্তূপ
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক এলাকায় ড্রেনেজ সংস্কারের কাজ চলায় পয়োবর্জ্য ও ময়লা জমে একাকার হয়ে আছে। স্থবির পানিতে মশার লার্ভা জন্ম নিচ্ছে। নগরবাসীর অভিযোগ, দুই সিটি করপোরেশনে একাধিকবার প্রশাসক বদল হলেও নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর না থাকায় তদারকি দুর্বল হয়ে পড়েছে। যার কারণে ঠিকমতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ হচ্ছে না। সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কর্মীরা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দায়সারাভাবে কাজ করছেন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আসার পর দায়িত্বের খাতিরে হলেও ঠিকঠাক মতো কাজ হবে বলে মনে করেন অনেকে।
সিটি করপোরেশনের অবস্থান
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিয়মিত মশক নিধনের দাবি করলেও মশা কেন মরছে না, তার কোনও সদুত্তর দিতে পারেনি। তবে মশার ওষুধের কার্যকারিতা যাচাই করতে সম্প্রতি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ডিএসসিসি। এই কমিটি মাঠপর্যায়ে খতিয়ে দেখবে ওষুধে আসলেই মশা মরছে কিনা এবং কর্মীরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন কিনা।
ডিএসসিসি’র নবনিযুক্ত প্রশাসক আব্দুস সালাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, "মশক নিধনের বিষয়টি আমি অতি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। মশক নিধনের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা আমি আসার সঙ্গে সঙ্গেই দিয়েছি। রাজধানীবাসীর ভোগান্তি হয় এমন সব বিষয় চিহ্নিত করে কীভাবে সমাধান করা যায় তার উদ্যোগ আমরা নেবো। অনেকে তো উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ ছিল, আমি বাস্তবায়ন করবো ইনশাআল্লাহ।"
বিশেষজ্ঞ ও মন্ত্রীর বক্তব্য
নগরবিদরা বলছেন, শুধু ধোঁয়া বা ফগিং দিয়ে মশক নিধন সম্ভব নয়। ফগিং দিয়ে কিছুটা কমলেও লার্ভা ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নগরবাসীর সহযোগিতাও জরুরি। নির্মাণাধীন ভবন, ছাদে জমে থাকা পানি, খোলা ড্রেন ও জলাবদ্ধ নিরসনে নগরবাসীর সহযোগিতার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সহ-সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, "সিটি করপোরেশনের গাফিলতি স্পষ্ট। তবে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। নির্মাণাধীন ভবন বা ছাদে পানি জমিয়ে রাখা যাবে না। এসব একজন নাগরিকের দায়িত্ব। এটাও যদি সিটি করপোরেশনকে জরিমানা করে করতে হয়— তাহলে তো হয় না।"
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল জলপথ ও স্থলপথ—উভয় দিক থেকে একযোগে মশক নিধন অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, "কিউলেক্স মশার উপদ্রব বেড়েছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছে।"
