গাজীপুরে মশার দাপটে অতিষ্ঠ নগরবাসী, সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতায় ক্ষোভ
গাজীপুরে মশার দাপটে অতিষ্ঠ নগরবাসী, করপোরেশনের ব্যর্থতা

গাজীপুরে মশার দাপটে নাজেহাল নগরবাসী, সন্ধ্যা হলেই বাড়ে উৎপাত

গাজীপুর নগরীতে মশার উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সন্ধ্যা নামলেই শহরজুড়ে বাড়তে থাকে মশার উৎপাত, যা নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বছরের পর বছর একই সমস্যায় ভোগান্তি পোহালেও কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।

ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা

নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যাপ্ত নালা ও নির্দিষ্ট বর্জ্য ফেলার স্থান না থাকায় যত্রতত্র ময়লা ফেলা হচ্ছে। জমে থাকা নোংরা পানিতে তৈরি হচ্ছে মশার প্রজনন ক্ষেত্র। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অধীনে বেশ কিছু এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সেগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

ফলে নগরজুড়ে জমে থাকা পানি আর পচা আবর্জনা মশার উপদ্রব বাড়াচ্ছে। এমনকি শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতেও মশার উপদ্রব থেকে রেহাই নেই। অনেক পরিবার দিনের বেলাতেও মশারি টানিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

প্রভাবিত এলাকাসমূহ

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজবাড়ি সড়ক, শিববাড়ী মোড়, জয়দেবপুর রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকা, চান্দনা চৌরাস্তা, দক্ষিণ ছায়াবিথী, হাড়িনাল ও কোনাবাড়ী টঙ্গীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সড়কের পাশে ও খোলা জায়গায় স্তূপ করে ফেলা হচ্ছে গৃহস্থালি বর্জ্য। অনেক স্থানে ড্রেন উপচে পড়ে ময়লা পানি সড়কে ছড়িয়ে পড়েছে। জমে থাকা এসব পানিতে অসংখ্য মশার লার্ভা দেখা গেছে।

এছাড়া রেললাইনের পাশ ও বাজারের পেছনে দীর্ঘদিন ধরে জমে আছে পচা আবর্জনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত ডাস্টবিন না থাকায় অনেকেই খোলা স্থানে ময়লা ফেলছেন। সিটি করপোরেশনের গাড়ি নিয়মিত না আসায় সেগুলো দিনের পর দিন পড়ে থাকছে।

বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়া

গাজীপুর শহরের মুন্সিপাড়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, "রাত নেই দিন নেই মশার যন্ত্রণা। সন্ধ্যার পর তো অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কয়েল জ্বালিয়েও গুড নাইট ব্যবহার করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। মশার যন্ত্রণায় দিনের বেলাতেও মশারি টানিয়ে থাকতে হচ্ছে।"

চৌরাস্তা এলাকার বাসিন্দা আশিকুর রহমান যোগ করেন, "সন্ধ্যার পর বাইরে বসে গল্প করার উপায় থাকে না। বছরের পর বছর কর দিচ্ছি, কিন্তু মশার ন্যূনতম সমস্যার সমাধান পাচ্ছি না।"

বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন প্রশ্ন

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মশক নিধনে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১০ লাখ ৩৪ হাজার ৬১৬ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৭ লাখ ৩৯ হাজার ৭০ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেড় কোটি এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে তিন কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়। ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও একই পরিমাণ বাজেট রাখা হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নগরবাসী।

নাগরিক কমিটির দাবি

গাজীপুর নাগরিক কমিটির সভাপতি জুলীয়াস চৌধুরী বলেন, "গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মশার বিস্তার এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনে-রাতে সমানতালে মশার উপদ্রবে নগরবাসী অতিষ্ঠ। নবনিযুক্ত প্রশাসক শওকত হোসেন সরকারকে অবিলম্বে সমন্বিত ও ফলপ্রসূ মশক নিধন কার্যক্রম শুরু করার আহ্বান জানাই।"

তিনি আরও দাবি জানান, প্রতিটি ওয়ার্ডে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ এবং অগ্রগতির দৈনিক প্রতিবেদন জনসমক্ষে তুলে ধরার মাধ্যমে নগরবাসীকে দৃশ্যমান ও টেকসই ফল প্রদান করতে হবে।

কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া

সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক সোহেল রানা মশার উপদ্রবের কথা স্বীকার করে বলেন, "বর্তমানে বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিচ্ছিন্নভাবে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। কিন্তু মশার উপদ্রব কমছে না। তবে কার্যকর ফল পেতে হলে একযোগে সমন্বিতভাবে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।"

গাজীপুর সিটি করপোরেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছেন নতুন প্রশাসক মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার। তিনিও নগরীতে মশার উপদ্রবের কথা স্বীকার করে বলেন, "আমরা সঠিক পরিকল্পনা করে ব্যাপকভাবে মশার ওষুধ স্প্রে করা হবে। এছাড়া নগরীতে ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করে ক্লিন সিটি এবং প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগিয়ে গ্রিন সিটি করা হবে।"

তিনি আরও বলেন, "নগরীতে ছোট-বড় ১৯টি খাল রয়েছে। এই খালগুলি খনন করা হবে। খাল খনন করে পানি প্রবাহ যদি ঠিক রাখা যায় তবে মশার বংশবিস্তার রোধ করা যাবে।"

গাজীপুর নগরবাসী এখন অপেক্ষায় রয়েছেন, কবে নাগাদ এই মশার দাপট থেকে মুক্তি পাবেন তারা। কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন হলে তবেই সম্ভব হবে এই জনস্বাস্থ্য সংকটের স্থায়ী সমাধান।