মাদক বিরোধী যুদ্ধের ব্যর্থতা: গবেষণা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের বিশ্লেষণ
মাদক বিরোধী যুদ্ধের ব্যর্থতা: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

মাদক বিরোধী যুদ্ধের ব্যর্থতা: একটি গভীর বিশ্লেষণ

দশকের পর দশক ধরে বিশ্বজুড়ে ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নীতির ব্যর্থতার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বারবার এই বিতর্কিত পথে হেঁটেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বিষয়টিকে আবারও জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। কিন্তু বৈশ্বিক তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার গভীরে না গিয়েই নীতিনির্ধারণের প্রবণতা থাকায় এ ধরনের উদ্যোগ প্রায়ই কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না, বরং ঘুরেফিরে ব্যর্থতার জন্ম দেয়।

গবেষণার আলোকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

আমার পিএইচডি গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাদকাসক্তি বিষয়ক। এ নিয়ে আমি একাধিক গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনা করেছি। সেই গবেষণা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ফলাফল ছিল উদ্বেগজনক। মাদকের বিরুদ্ধে সেই অভিযানের সময় দেশজুড়ে অন্তত ১৩০ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। একই সঙ্গে এই অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে যে, মাদক সমস্যার অন্তর্নিহিত জটিল বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের গুরুতর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

মাদকাসক্তির পেছনে থাকা আত্ম-চিকিৎসা প্রবণতা, অর্থাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে ওষুধ গ্রহণের সিদ্ধান্ত, ক্ষতি হ্রাসের নীতি, এবং মাদক-বাজারের চাহিদা, জোগান ও অপব্যবহারের পারস্পরিক সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। নীতিগত প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও কাঠামোগত দুর্বলতা ছিল স্পষ্ট।

মাদকাসক্তির মূল কারণ ও জটিলতা

এই জটিল সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে কয়েক মৌলিক প্রশ্ন। প্রথমত, একই সামাজিক পরিবেশে থেকেও কেন কেউ আসক্তিমূলক মাদক ব্যবহার করে, আর কেউ করে না? দ্বিতীয়ত, কেন সব আসক্ত ব্যক্তি একই ধরনের মাদক ব্যবহার করে না? এরপর আসে আরেকটি প্রশ্ন, কেন মাদক-বাজারে কঠোর অভিযান প্রায়ই উল্টো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়?

গবেষণায় দেখা গেছে, নানা কারণ মানুষকে মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং জীবনের সামগ্রিক মান। আসক্তির ঝুঁকির প্রায় অর্ধেকই জিনগত প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। জৈবিক ও পরিবেশগত বিভিন্ন উপাদান একত্রে কাজ করে মানুষকে গভীর মানসিক যন্ত্রণা কিংবা মানসিক রোগের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

কিন্তু মানসিক অসুস্থতা অনেক সময় ক্যানসারের মতো নীরবে বেড়ে ওঠে। এর লক্ষণ সব সময় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে না। ফলে অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাঁরা ভেতরে-ভেতরে ভেঙে পড়ছেন। আর যখন উপলব্ধি করেন, তখন সামাজিক কলঙ্ক ও লজ্জার কারণে সেই কষ্ট প্রকাশ করাও কঠিন হয়ে ওঠে।

আত্ম-চিকিৎসা ও মাদকের সম্পর্ক

‘আত্ম-চিকিৎসা’ ধারণাটি সহজভাবে বলতে গেলে এমন যে, সাধারণ মানুষ ব্যথা কমাতে ওষুধ খান বা জেগে থাকতে কফি পান করেন, তেমনি কেউ কেউ মানসিক যন্ত্রণা কমাতে শক্তিশালী মাদকের আশ্রয় নেন। বাজারে যেমন বিভিন্ন ধরনের ব্যথানাশক পাওয়া যায়, তেমনি সম্ভাব্য আসক্ত ব্যক্তিও নানা ধরনের মাদক ব্যবহার করে দেখেন। যেটি তাঁর মানসিক কষ্ট সাময়িকভাবে লাঘব করে, সেটির প্রতিই তিনি ঝুঁকে পড়েন।

একজন আসক্ত ব্যক্তি কখনো কখনো মাদকের প্রয়োজন অনুভব করতে পারেন ঠিক যেমন একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর ওষুধের প্রয়োজন হয়। তবে এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। অপব্যবহৃত মাদক মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে আকস্মিক মৃত্যুর ঝুঁকিও তৈরি করে। এই কারণেই বিশেষ চিকিৎসা তত্ত্বাবধান ছাড়া চিকিৎসকেরা সাধারণত এসব পদার্থ ব্যবহারের পরামর্শ দেন না।

কঠোর অভিযানের ব্যর্থতা ও বাজারের রূপ বদল

আসক্তিমূলক মাদকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, তা হঠাৎ বন্ধ করলে তীব্র শারীরিক ও মানসিক উপসর্গ দেখা দেয়, যাকে প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ বলা হয়। এই যন্ত্রণা এড়াতেই অনেকে আবার মাদক গ্রহণ করেন। ফলে চাহিদা বজায় থাকে। আর যেখানে চাহিদা থাকে, সেখানে কোনো না কোনোভাবে জোগানও তৈরি হয়।

কিন্তু এই জোগান যেহেতু অবৈধ ও নিয়ন্ত্রণহীন পথে আসে, তাই এর সঙ্গে যুক্ত হয় পাচার, সহিংসতা এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ। এ অবস্থায় কর্তৃপক্ষ প্রায়ই কঠোর অভিযানের পথ বেছে নেয়। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এ ধরনের অভিযান অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না।

আসক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে একাধিক জটিল সমস্যা তৈরি হয়। এর মধ্যে রয়েছে বাস্তুচ্যুতি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি, চিকিৎসাসেবা থেকে দূরে সরে যাওয়া এবং নির্বিচার আটক। এসব পদক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে জনস্বাস্থ্যব্যবস্থায়। চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পরিবর্তে দমনমূলক পন্থা গ্রহণ করলে আসক্ত ব্যক্তিরা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়েন।

অন্যদিকে সরবরাহকারীদের গ্রেপ্তার করলে বাজারে সাময়িকভাবে জোগান কমে যায়। কিন্তু চাহিদা তো তাৎক্ষণিকভাবে কমে না। ফলে বাজারে কৃত্রিমভাবে দাম বেড়ে যায়। এর দুটি বড় প্রভাব দেখা দেয়। প্রথমত, মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা মাদকের জন্য অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে খাদ্য ও পুষ্টির মতো মৌলিক চাহিদা বিসর্জন দিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, গ্রেপ্তার হওয়া বিক্রেতাদের শূন্যস্থান পূরণ করতে নতুন লোক বাজারে প্রবেশ করেন। বাড়তি দামের কারণে অধিক লাভের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় এ প্রবণতা আরও উৎসাহিত হয়।

মাদকের বাজার স্থির নয়, এটি ক্রমাগত রূপ বদলায়। আইন প্রয়োগ এড়াতে বা নিয়ন্ত্রণের ফাঁকফোকর কাজে লাগাতে নতুন, পরীক্ষামূলক এবং কখনো প্রাণঘাতী মাদক বাজারে প্রবেশ করে। উত্তর আমেরিকায় ফ্যান্টানিল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা যেমন রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশে ডান্ডি বা গ্লু সেবনের প্রবণতা দেখা গেছে। সম্প্রতি দেশেও অবৈধ ক্রিস্টাল মেথ ও এমডিএমএ প্রস্তুতকারক ল্যাবের সন্ধান পাওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

কেবল একটি নির্দিষ্ট মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে প্রায়ই তার জায়গায় আরেকটি, কখনো সমান বা আরও বেশি ক্ষতিকর মাদক স্থান দখল করে। ফলে সমস্যার রূপ বদলালেও মূল সংকট থেকে যায়। তাই প্রমাণভিত্তিক, সমন্বিত নীতিমালা এবং ক্ষতি কমানোর সেবার বিস্তৃতি ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতা ও সম্ভাব্য সমাধান

নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান সীমিত হলেও ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে প্রায় ২৫ থেকে ৭০ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে মাদকাসক্তির সঙ্গে যুক্ত। ২০১৭ সালে এক বছরে ৪ কোটিরও বেশি ইয়াবা বড়ি জব্দ করা হয়েছিল। রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে ক্ষতি কমানোর সেবা, যেমন কাউন্সেলিং, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা এখনো অত্যন্ত সীমিত এবং অল্পসংখ্যক মানুষের নাগালে পৌঁছায়। আসক্ত ব্যক্তিদের জন্য কার্যকর পুনর্বাসন বা সংশোধনমূলক ব্যবস্থার একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়।

সমাধান অবশ্যই স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে হতে হবে। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কিছু দিকনির্দেশ দিতে পারে:

  • প্রাথমিক প্রতিরোধ: ঝুঁকিপূর্ণ কারণগুলো চিহ্নিত করে তরুণদের মাদকের বাইরে রাখার উদ্যোগ।
  • চিকিৎসা ও পুনর্বাসন: যাঁরা ইতিমধ্যে আসক্ত, তাঁদের জন্য চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতি কমানোর সেবা।
  • গবেষণাভিত্তিক নীতি: ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলা।

মাদক সমস্যা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি বিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য ও মানবিকতার প্রশ্ন। একে শুধু অপরাধ দমনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সমস্যার মূল কারণ অধরাই থেকে যায়। শুধু অপরাধী শনাক্তকরণ বা অভিযানের মাধ্যমে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান, সহমর্মিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিকল্পনার সমন্বিত প্রয়োগ।