ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মশা নিধনে চরম ব্যর্থতা: কমিটি গঠন ও তদন্তের সিদ্ধান্ত
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মশা নিধন কার্যক্রমে মারাত্মক ব্যর্থতা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীতে মশার উপদ্রব অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় করপোরেশন বাধ্য হয়ে একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে দেখবে মশার ওষুধে কার্যকর ফল পাওয়া যাচ্ছে কিনা এবং নিয়োজিত কর্মীরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন কিনা।
মশা নিধনে বিশাল বরাদ্দ সত্ত্বেও ব্যর্থতা
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মশা নিধনের কাজে বর্তমানে ১ হাজার ৩০ জন কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ডে সকালে সাতজন ও বিকেলে ছয়জন কর্মী মশার ওষুধ ছিটানোর কথা। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
দক্ষিণ সিটির হিসাব বিভাগের তথ্য অনুসারে, শুধুমাত্র মশা নিধন কার্যক্রমেই গত পাঁচ বছরে প্রায় ১৮৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এই কার্যক্রমের জন্য ৪৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আগের বছরের ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ের কাছাকাছি।
তবে জনগণের করের এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও মশা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে।কর্মীদের দায়িত্বহীনতা ও রাজনৈতিক প্রভাব
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দক্ষিণ সিটিতে একাধিকবার প্রশাসক বদল হলেও নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর না থাকায় তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। মশা নিধনের কাজে নিয়োজিত কিছু কর্মী রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদকের সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, গত বৃহস্পতিবার বেলা তিনটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটির ২০ নম্বর ওয়ার্ডের অধীন জাতীয় প্রেসক্লাব, সেগুনবাগিচা, বিজয়নগর, নয়াপল্টন ও কাকরাইল এলাকার মূল সড়ক ও বিভিন্ন অলিগলিতে মোটরসাইকেলে ঘুরেও কোথাও মশকনিধন কর্মীদের দেখা পাওয়া যায়নি।
ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ
ঢাকা দক্ষিণ সিটির স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মশার লার্ভা ধ্বংস করতে সকালে টেমিফস নামের একটি ওষুধ স্প্রে করা হয়, যা ভারত থেকে আমদানি করা হয়। আর বিকেলে উড়ন্ত মশা মারতে মেলাথিউন নামের ওষুধ দিয়ে ফগিং করা হয়, যা চীন থেকে আনা হয়।
স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, "পরীক্ষাগারে ওষুধের কার্যকারিতা ঠিকমতো পাওয়া গেলেও মাঠে প্রয়োগের পর কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিকেলের ফগিংয়ের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, যেসব মশার গায়ে ধোঁয়া সরাসরি লাগছে, সেগুলো মারা যাচ্ছে; যেগুলোর গায়ে লাগছে না, সেগুলো মরছে না।"
প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তার উদ্বেগ ও কমিটি গঠন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান স্বীকার করেছেন যে বেইলি রোড এলাকায় তাঁর বাসার আশপাশে নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হলেও মশার উপদ্রব কমছে না। এ কারণেই ওষুধের কার্যকারিতা যাচাইয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, "ওষুধের কার্যকারিতা যাচাইয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা দ্রুতই প্রতিবেদন দেবে। প্রতিবেদন যাতে নিরপেক্ষ হয় তাই কমিটিতে স্বাস্থ্য বিভাগের কাউকে রাখা হয়নি। কমিটির প্রধান করা হয়েছে সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাকে।"
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ও অস্বস্তি
গত দুই দিনে খিলগাঁও, ধানমন্ডি, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন, লালবাগ ও চকবাজার—ঢাকা দক্ষিণ সিটির ছয়টি এলাকায় ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানি মিলিয়ে ৩২ জনের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। প্রত্যেকেই বলেছেন, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে হঠাৎ মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে।
- ফুটপাতের দোকানির মো. রোকন বলেছেন, "মশার যন্ত্রণায় বিকেলের পর ঠিকমতো বেচাবিক্রি করা যায় না।"
- ধানমন্ডি লেকসংলগ্ন একটি বাড়ির বাসিন্দা আহমেদ রনি বলেন, "সন্ধ্যার পর বারান্দায় দাঁড়ানো কঠিন হয়ে গেছে।"
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সমন্বিত পরিকল্পনার আহ্বান
নগরবিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ধোঁয়া বা ফগিং দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ফগিং মূলত পূর্ণবয়স্ক মশা কমাতে কার্যকর হলেও লার্ভা ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নির্মাণাধীন ভবন, ছাদে জমে থাকা পানি, খোলা ড্রেন ও জলাবদ্ধ জায়গাগুলোয় নিয়মিত নজরদারি না থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন।
গত কয়েক বছরে রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, মশা নিধনে শুধু মৌসুমি ও লোকদেখানো অভিযান নয়, বছরব্যাপী সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষ করে ওয়ার্ডভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ, নিয়মিত তদারকি এবং মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি জোরদার করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
