মশার আক্রমণে অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী, গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য
মশার আক্রমণে অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী, গবেষণায় উদ্বেগ

মশার আক্রমণে অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী, গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য

রাজধানী ঢাকায় মশার উপদ্রব ক্রমাগত বাড়ছে, যা সাধারণ জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। দিনমজুর থেকে শুরু করে চাকরিজীবী, সবাই মশার কামড়ে অতিষ্ঠ। গতকাল বিকেলে কারওয়ান বাজারে দেখা গেছে, দিনের বেলায় মশারি টানিয়ে ঘুমাচ্ছেন শ্রমিকেরা। অন্যদিকে, আদাবরের একটি পাঁচতলা বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত-পা নেড়ে মশা তাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী রাশেদুল ইসলাম।

রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘সারা দিন অফিস করে এসে একটু শান্তিতে বসব, সেই উপায় নেই। মনে হয়, ঘরে ঢুকলেই মশার ঝাঁক অপেক্ষা করে আছে। রাতে মশারির মধ্যেও ঢুকে পড়ে মশা।’ তাঁর আট বছরের ছেলের পায়ে ও হাতে ছোট ছোট ঘা দেখা দিয়েছে, যা বারবার চুলকানোর ফলে চামড়া উঠে যাচ্ছে। শিশুটির মা বলেন, ‘ও বুঝতেই পারে না কখন কামড়ায়। পরে দেখি লাল হয়ে ফুলে গেছে।’

গবেষণায় উদ্বেগজনক ফলাফল

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, জানুয়ারি মাসের তুলনায় চলতি ফেব্রুয়ারিতে মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আর মশার ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। মার্চে মশার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

গবেষণায় দুই ভাবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে:

  • লার্ভা বা শূককীটের ঘনত্ব: জানুয়ারিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া গেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে ১ হাজার ২৫০-এ দাঁড়িয়েছে।
  • প্রাপ্তবয়স্ক মশার উপস্থিতি: জানুয়ারিতে এক ঘণ্টায় ৪০০ থেকে ৬০০টি মশা কামড়াতে আসত, ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে গড়ে ৮৫০টি হয়েছে।

অধ্যাপক বাশার বলেন, ‘এক ঘণ্টায় পাঁচটি মশা কামড়াতে এলেই বিশ্বমানে তা বেশি। সেখানে ঢাকায় ৮৫০টি, এটি কেবল সংখ্যা নয়, এটি একটি বিপৎসংকেত।’

মশা বৃদ্ধির কারণ

বিশেষজ্ঞরা তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:

  1. এবার শীতের মাত্রা কম ছিল এবং স্বাভাবিকের চেয়ে আগেই শীত বিদায় নিয়েছে, যা মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
  2. নর্দমা ও জলাশয়ের দূষণ যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি, যা কিউলেক্স মশার প্রধান প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে।
  3. রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে জনপ্রতিনিধির অভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সঠিকভাবে এগোচ্ছে না।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক জি এম সাইফুর রহমান বলেন, ‘তাপমাত্রা বাড়লে মশার জীবন চক্র দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং স্ত্রী মশার রক্তপানের চাহিদা বাড়ে, যা দ্রুত বংশবিস্তারে ভূমিকা রাখে।’

এলাকাভিত্তিক পার্থক্য

গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর সর্বত্র সমানভাবে মশা নেই। কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, শনির আখড়া, শ্যামপুর, রায়েরবাজার, উত্তরা ও সাভার এলাকায় লার্ভা ও প্রাপ্তবয়স্ক মশার ঘনত্ব বেশি। অন্যদিকে শাহবাগ ও পরীবাগের মতো মধ্য রাজধানী এলাকায় তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে।

নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সুমনা হক বলেন, ‘বারান্দায় দাঁড়ানো যায় না। বিকেল হলেই মশার আক্রমণ শুরু হয়।’ কলাবাগানের এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী যোগ করেন, ‘পড়ার টেবিলে বসতে গেলেই মশা ঘিরে ধরে। অ্যারোসল ছিটালে কিছুক্ষণ কমে, তারপর আবার আগের মতো।’

ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, ‘জলাশয় ব্যবস্থাপনা সত্যিই খুব জটিল। একবার পরিষ্কার করলে দ্রুতই আবার আবর্জনায় ভরে যায়।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে জনপ্রতিনিধিরা না থাকায় স্থানীয় সমস্যা সমাধানে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে।

মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে নাগরিকদের সচেতনতা ও কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।