চট্টগ্রামে হঠাৎ করে আলোচনায় এসেছে প্রাণঘাতী 'জাপানিজ এনকেফালাইটিস' ভাইরাস। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকার মৃত্যুতে জনমনে মশাবাহিত এই রোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কিউলেক্স মশার কামড়ে এই রোগ ছড়ায়। শূকর ও বুনো পাখি এই ভাইরাসের প্রধান উৎস। তবে মানুষ থেকে মানুষে এই রোগ ছড়ায় না।
শিক্ষিকার মৃত্যু ও রোগের প্রাদুর্ভাব
গত বৃহস্পতিবার ৩৬ বছর বয়সী চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ফ্যাকাল্টির ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক জাকিয়া সুলতানা জুথি মারা যাওয়ার পর এই রোগের প্রাদুর্ভাব আলোচনায় আসে। চিকিৎসকরা জানান, কিউলেক্স মশার মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায় এবং মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
পরীক্ষার সংকট
মশাবাহিত এই ভাইরাস চিহ্নিত করতে আরটিপিসিআর পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই পরীক্ষা চট্টগ্রামে চমেক হাসপাতাল, বিআইটিআইডিসহ সরকারি কোনো হাসপাতালের ল্যাবে হয় না। পরীক্ষার জন্য সরকারিভাবে কিট সরবরাহ নেই। বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও এই পরীক্ষা হচ্ছে না। চিকিৎসকরা এর পরীক্ষার জন্য রোগের পরামর্শ দেয়নি।
ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি ল্যাবের ইনচার্জ ডা. জাকির হোসেন বলেন, 'আমাদের পিসিআর মেশিন আছে। তবে জাপানিজ এনকেফালাইটিস নির্ণয়ের পরীক্ষা আমাদের ল্যাবে হয় না। এটি নতুন একটি পরীক্ষা।' চমেক হাসপাতালের ল্যাব ইনচার্জ শুভাশীষ বড়ুয়া জানান, তাদেরও এই পরীক্ষা হয় না। চট্টগ্রামে বেসরকারি পর্যায়ে সবচেয়ে বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টার শেভরণের জেনারেল ম্যানেজার পুলক পাড়িয়াল বলেন, 'এটি নতুন পরীক্ষা। আমাদের ল্যাবে এর পরীক্ষা হয় না।'
রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা
মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুর পর জাপানিজ এনকেফালাইটিস ভাইরাস দেখা দিয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ে এমনিতে জনমনে আতঙ্ক রয়েছে। চিকিৎসকরা জানান, ভাইরাসজনিত এই রোগ নতুন নয়। তবে জ্বর, সর্দি, মাথাব্যথা, খিঁচুনি নিয়ে রোগী চিকিৎসকের কাছে গেলে ডেঙ্গু ও ম্যালিয়ার পরীক্ষা করে থাকেন। জাপানিজ এনকেফালাইটিস চিহ্নিত করতে আরটিপিসিআর নামে পরীক্ষাটি করতে হয়। এই পরীক্ষা সাধারণত চিকিৎসকরা দেন না। ফলে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে আগে মারা গেলেও প্রকাশ পায়নি।
চট্টগ্রামের ফৌজদারহাট বিআইটিআইডির সহযোগী অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশীদ বলেন, 'জাপানিজ এনকেফালাইটিস কমন রোগ। এর আরটিপিসিআর পরীক্ষাটি এখন গুরুত্ব দিতে হবে। এই টিকার জন্য কিটের দরকার হবে। এই রোগ মস্তিষ্কে মারাত্মক ক্ষতি করে। সময়মতো চিকিত্সা না হলে প্রাণঘাতী হয়ে উঠে।'
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'জাপানিজ এনকেফালাইটিস একটি ভাইরাসজনিত মস্তিষ্কে সংক্রমণ। প্রাথমিক লক্ষণ হিসাবে জ্বর, মাথাব্যথা ও বমি দেখা যায়। গুরুতর হলে খিঁচুনি, অচেতনতা ও পক্ষঘাত হতে পারে। শিশুরাই এই রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। তবে বয়স্করাও আক্রান্ত হয়ে থাকে। এই রোগের কোন অ্যান্টিভাইরাল চিকিত্সা নেই। শুধু উপসর্গ অনুযায়ী চিকিত্সা দেওয়া হয়। মশা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধকমূলক টিকা এই রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো চিকিত্সা না নিলে প্রাণঘাতী হতে পারে।'
টিকা ও সচেতনতা
চিকিৎসকরা জানান, শিশুদের হাম, টাইফয়েট, যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন টিকা দেওয়া হচ্ছে। জন্মের পর থেকে ১৫ মাস পর্যন্ত শিশুদের ছয়টি টিকা দেওয়া হয়। এসব টিকা ১০টি রোগের প্রতিরোধে কাজ করে। সময়মতো এই টিকাগুলো দিতে হবে। দেখা যায় অনেকেই শিশুদের ৯ মাস বয়সী টিকা দিলেও ১৫ মাস বয়সী টিকা দেওয়া হয় না। সচেতনতার অভাবে গ্রামে সকল টিকা থেকে অনেক শিশু বঞ্চিত হয়ে থাকে। এতে শিশুরা পুষ্টির ঘাটতিসহ নানা ধরনের জটিলতায় পড়ে। এখনো ম্যালেরিয়ার টিকা আবিষ্কৃত হয়নি। তাই ম্যালেরিয়াসহ অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে সকল টিকা সময়মতো দেওয়া জরুরি।



