পাঁচ মাসের শিশু বকরের শুরুতে জ্বর, পরে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত হাম শনাক্ত হয়। বরিশালের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা শুরু হয়। পরে শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেও উন্নতি না হওয়ায় রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু এই দুই হাসপাতাল থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয় বকরকে। কারণ তার পিআইসিইউ সেবা প্রয়োজন। কিন্তু পিআইসিইউর সিট খালি নেই।
তিন মাসে তিন লাখ টাকা খরচ
মা কোহিনূর বেগম একটি প্রাইভেট হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালে মিলে ১৫ দিন চিকিৎসা করিয়ে তিন মাস আগে বরিশালে ফিরে যান। এতে তার তিন লাখ টাকা খরচ হয়। তিনি গয়না বিক্রি করেছেন। তারপরও ছেলে সুস্থ হয়নি। তিন মাসের মধ্যে আবার হামের সংক্রমণে ছেলের গুরুতর অবস্থা নিয়ে চলে আসেন ঢাকায়। এবারও শিশু হাসপাতালে এসে জানতে পারেন পিআইসিইউ সেবা প্রয়োজন। কিন্তু শিশু হাসপাতালে পিআইসিইউর সিট খালি নেই। পরে বিজয় সরণির একটি প্রাইভেট হাসপাতালে পিআইসিইউতে চিকিৎসা শুরু করেন ৪ মে।
স্বামী চলে গেলেন
৫ মে তার স্বামী আইয়ুব মিয়া স্ত্রী ও সন্তানকে হাসপাতালে ফেলে চলে যান। আইয়ুব মিয়া ফোনে অভিযোগ করে বলেন, ছেলের এই অবস্থার জন্য কোহিনূরই দায়ী। তিনি আর কোনো দায় নিতে পারবেন না। আর তার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়। মা কোহিনূর এখন সেই হাসপাতালের পিআইসিইউর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন। আত্মীয়স্বজন ও চিকিৎসকদের দয়া-করুণায় ছেলের চিকিৎসা চলছে বলে তিনি জানান।
ছয় মাসের নিচে শিশুদের ঝুঁকি বেশি
শিশু হাসপাতালের হাম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলছেন, ছয় মাসের নিচে শিশুদের রোগ-প্রতিরোধক্ষমতা কম। টিকা না দেওয়ার কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে শিশুরা। একবার ভালো হলেও পরের ছয় মাস এসব শিশুর রোগপ্রতিরোধ কম থাকে। এই সময়ে বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন। কিন্তু অনেক শিশুর পরিবারে সেই সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। ফলে আবারও শিশু আক্রান্ত হয়ে আসে হাসপাতালে। তাদের ঝুঁকিও বেশি। এই অবস্থায় একমাত্র সন্তান, বিয়ের অনেক দিন পরে জন্ম নেওয়া সন্তানসহ হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে পিআইসিইউ খুঁজে বেড়াচ্ছেন অনেক বাবা-মা।
বিশ্ব মা দিবসে হাহাকার
গত শুক্র ও শনিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল ও প্রাইভেট হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়—হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে মায়েদের হাহাকার। এই পরিস্থিতির মধ্যেই আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব মা দিবস।
টেস্টটিউব সন্তান হারালেন ফারজানা
১১ বছর পর টেস্টটিউবে জন্ম নেওয়া ফাইয়াজকে হারালেন ফারজানা। শিশু হাসপাতালে ফাইয়াজ হাসান তাজিম মারা যায় ২২ এপ্রিল। চাঁদপুর থেকে মা ফারজানা ইসলাম মোবাইল ফোনে জানান, গত মার্চ মাস থেকে তাজিমকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরেছেন। ছেলের প্রথমে নিউমোনিয়া, পাতলা পায়খানা শুরু হয়, তারপর হাম। চাঁদপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে আসেন ঢাকা শিশু হাসপাতালে। এখানেই আট মাস ১৮ দিন বয়সি তাজিম হামে মারা যায়। ফারজানা ইসলাম-হেলাল ভূঁইয়া দম্পতির বিয়ের ১১ বছর পর টেস্টটিউবে তাজিমের জন্ম হয়। ফারজানা জানান, নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড মোড়ের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার মধ্যপথে ২৫ মার্চ ছেলেকে নিয়ে বাড়ি নিয়ে যান। অবস্থা খারাপ হলে আবার আসেন ঢাকায়। প্রথমে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে, শেষে শিশু হাসপাতালে যান। ফারজানা বলেন, 'শিশুদের জন্য পিআইসিইউর এত অভাব কেন। পিআইসিইউর সেবার জন্য আমার বাচ্চাটাকে নিয়ে কত ঘোরাঘুরি করেছি।' ফারজানার আর এই বিষয় আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না।
হাসপাতালের বক্তব্য
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক বলেন, 'একজন অভিভাবক হিসেবে প্রতিদিন হামে মৃত্যু দেখা কষ্টকর। হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে হামের শিশুদের চিকিৎসার খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। ক্ষেত্রে বিশেষে কাউকে সহযোগিতাও করা হচ্ছে। হামের চিকিৎসার জন্য আমরা শুরুতেই ১৬ বেডের আইসিইউ এবং ৩০ বেডের সাধারণ ওয়ার্ড করা হয়। পরে তা বেড়ে এখন ৮২ বেডের ইউনিট করা হয়েছে। শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত জটিলতার জন্য ১৬ বেডের বিশেষ আইসিইউ আছে এখানে।' বিভাগীয় মেডিক্যাল কলেজগুলোতে অল্পসংখ্যক সিট হলেও আইসিইউ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, 'আমাদের ভ্যাকসিন দেওয়ার হার ছিল ৯৭ শতাংশ, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ৫৭ শতাংশে নেমে আসে।'



