চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে ২২ দিনের লড়াই শেষে চার মাস ১০ দিন বয়সী শিশু আবদুল্লাহ আল সাফওয়ানের মৃত্যু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে শিশুটি। তার মা জান্নাতুল ফেরদৌস এখন শুধু স্মার্টফোনে রাখা ছেলের ভিডিও দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।
শিশুটির পরিবারের কথা
দেড় বছর আগে বিয়ে হয় জান্নাতুল ফেরদৌসের (২০)। তাঁর স্বামী আবদুল্লাহ মো. রাসেল চট্টগ্রাম নগরের একটি নাশতার দোকানের কারিগর। সীমিত আয় দিয়ে সুখেই দিন কাটছিল তাঁদের। চার মাস আগে ঘরে আসে ছেলেশিশু। ঘরজুড়ে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। বাবার সঙ্গে মিল রেখে নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ আল সাফওয়ান। সময়ের সঙ্গে হাসতে শেখে সাফওয়ান। তার হাসির মুহূর্তগুলো মুঠোফোনে ভিডিও করে রাখতেন জান্নাতুল।
জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, 'আমার বাবুর হাসিমাখা মুখ কখনো ভুলতে পারব না। আমার সব অভাব ভুলিয়ে দিয়েছিল সে। তার ভিডিও করে রাখতাম বড় হলে তাকে দেখাব বলে। কিন্তু আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেল।'
হামের প্রাদুর্ভাব
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২৯ এপ্রিল থেকে গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৩৩ জন ভর্তি ছিল। যার মধ্যে ২৩০ জনই নগরের হাসপাতালগুলোতে। জেলায় এ পর্যন্ত ১০৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। হামে মৃত্যু একজনের। সন্দেহজনক হামের রোগী ১ হাজার ৮৮, সুস্থ হয়ে ফিরেছে ৮৫৫ জন।
চিকিৎসার খরচ ও শেষ লড়াই
পরিবারের সদস্যরা জানান, ২২ দিন আগে জ্বর ও কাশি শুরু হয় শিশু সাফওয়ানের। স্থানীয় পল্লিচিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে চার দিনেও উন্নতি হয়নি। পরে ১৯ এপ্রিল বিকেলে উপজেলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে সন্ধ্যায় সারা শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়। চিকিৎসক হাম শনাক্ত করে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। কিন্তু দরিদ্র পরিবারটি ব্যয়বহুল চিকিৎসা খরচ বহনে অক্ষম ছিল।
সেদিন রাতেই সাফওয়ানকে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরের দিন স্বজনদের কাছ থেকে টাকা ধার এনে আবার বেসরকারি হাসপাতালে যান। সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। ২১ এপ্রিল রাতে সেখানে পৌঁছান। অবস্থার অবনতি হলে দুই দিন পর তাঁকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। একদিকে সন্তানকে বাঁচানোর আকুতি, অন্যদিকে চিকিৎসা খরচ জোগাতে ধার ও সাহায্য চান জান্নাতুল। চট্টগ্রাম মেডিকেলের এক চিকিৎসক তিন হাজার টাকা, ফেসবুকে আরেকজন দুই হাজার টাকা দেন। মোট প্রায় ৮০ হাজার টাকা ধার করেন। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে বৃহস্পতিবার বিকেলে মৃত্যু হয় সাফওয়ানের। ওই দিন এশার নামাজের পর জানাজা শেষে তাকে সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।



