শহরের বড় বড় রাস্তা, ফ্লাইওভার ও ট্রাফিক জ্যাম আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। চারদিকে শুধু ইট-পাথরের দালান ও পিচঢালা কালো রাস্তা। এই ব্যস্ত শহরের জীবন আমাদের অনেক সুবিধা দেয় ঠিকই, কিন্তু এর একটা বড় খারাপ দিকও আছে। আমরা হয়তো ভাবি, গাড়ির কালো ধোঁয়া বা হর্নের বিকট শব্দ শুধু আমাদের ফুসফুস ও কানেরই ক্ষতি করে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এবার এক নতুন এবং বেশ চমকে দেওয়ার মতো তথ্য দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, শহরের এই বড় বড় রাস্তা ও গাড়ির ভিড় সরাসরি আমাদের মনের ওপর চাপ ফেলে। এমনকি রাস্তাঘাটের কাঠামোর কারণে মানুষের মানসিক অসুস্থতাও বেড়ে যেতে পারে!
গবেষণার মূল ফলাফল
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্য বিভাগের একদল গবেষক সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁদের গবেষণার মূল জায়গা ছিল নিউইয়র্ক শহর। আমরা সাধারণত জানি, গাড়ির ধোঁয়া ও বাতাসের দূষণ আমাদের মনের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলে। কিন্তু এই বিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ নতুন একটা দিকে নজর দিয়েছেন। তাঁরা দেখার চেষ্টা করেছেন, শহরের রাস্তাঘাট ও গাড়ি কীভাবে একটা এলাকার মানুষকে একে অপরের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই বিচ্ছিন্নতার কারণে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে কী ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়ে, সেটাই ছিল তাঁদের গবেষণার মূল বিষয়।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক স্বাস্থ্য
গবেষক জেইমি বেনাভিডেস একটি চমৎকার দৃশ্য কল্পনা করতে বলেছেন। এমন একটা এলাকার কথা মাথায় আনো, যেখানে গাড়ি আছে, কিন্তু গাড়ির চেয়ে মানুষের প্রাধান্য বেশি। সেখানে হাঁটার জন্য সুন্দর চওড়া ফুটপাত আছে, রাস্তা পার হওয়ার নিরাপদ জায়গা আছে। বিকেলবেলা বাচ্চারা নিশ্চিন্তে বাইরে খেলছে, প্রতিবেশীরা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে খোশগল্প করছে। এ ধরনের পরিবেশ মানুষের মন ভালো রাখে, একে অপরের সঙ্গে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে।
কিন্তু যখন কোনো আবাসিক এলাকার ঠিক মাঝখান দিয়ে বড় কোনো হাইওয়ে বা ব্যস্ত রাস্তা চলে যায়, তখন সেই এলাকার মানুষ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। রাস্তা পার হয়ে ওপাশে যাওয়াটা তখন রীতিমতো যুদ্ধের মতো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে মানুষের মধ্যে যোগাযোগ একদম কমে যায়।
কমিউনিটি সেভারেন্স ইনডেক্স
এই বিচ্ছিন্নতা বা একা হয়ে যাওয়াটা মাপার জন্য বিজ্ঞানীরা একটা বিশেষ সূচক বা স্কেল তৈরি করেছেন। এর নাম দেওয়া হয়েছে কমিউনিটি সেভারেন্স ইনডেক্স। বড় রাস্তা, অতিরিক্ত ট্রাফিক এবং ফুটপাতের অভাব কীভাবে একটা এলাকার মানুষদের শারীরিক ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তা এই সূচক দিয়ে মাপা হয়। এই দারুণ কাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন গবেষক মারিয়ান্থি-আন্না কিউমোর্টজোগলু।
বিজ্ঞানীরা নিউইয়র্ক শহরের বিভিন্ন এলাকার তথ্য বিশ্লেষণ করে এক ভয়াবহ চিত্র পেয়েছেন। তাঁরা দেখেছেন, যেসব এলাকার মানুষ রাস্তাঘাটের কারণে একে অপরের থেকে বেশি বিচ্ছিন্ন, সেখানে সিজোফ্রেনিয়ার মতো জটিল মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার হার অনেক বেশি। সিজোফ্রেনিয়া হলো মনের এমন এক অবস্থা, যেখানে মানুষ বাস্তব থেকে দূরে সরে যায় এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপে ভোগে। এই ফলাফল শিশু থেকে বৃদ্ধ—যেকোনো বয়সের মানুষের জন্যই সত্যি।
শুধু বায়ুদূষণ নয়
আজকাল পরিবেশ বাঁচাতে অনেকেই বৈদ্যুতিক গাড়ি চালানোর কথা বলছেন। এতে কালো ধোঁয়া কমবে ঠিকই, কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু এটাই মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। গবেষক মারিয়ান্থি-আন্না বলেছেন, ‘বৈদ্যুতিক গাড়ির কারণে বায়ুদূষণ কমবে, যা দারুণ ব্যাপার। কিন্তু আমাদের শুধু গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমালে চলবে না। আমাদের এমনভাবে শহর গড়তে হবে, যা মানুষকে আলাদা না করে বরং সবাইকে একসঙ্গে মেলায়।’
কেন এমনটা হয়?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, যখন বড় রাস্তার কারণে একটা এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন সেখানকার মানুষ সহজে অন্যদের সঙ্গে মিশতে পারে না। রাস্তায় নিশ্চিন্তে হাঁটাচলা বা ব্যায়াম করা কমে যায়। রাস্তা পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার ভয় সব সময় মনের ভেতর একটা চাপা আতঙ্ক বা স্ট্রেস তৈরি করে। সবচেয়ে বড় কথা, আড্ডা দেওয়া বা সামাজিক যোগাযোগ একদম কমে যাওয়ায় মানুষ নিজের ঘরে একা হয়ে পড়ে। আর এই একাকিত্বই মনের রোগের সবচেয়ে বড় কারণ।
সমাধানের পথ
গবেষক বেনাভিডেস মনে করেন, নগর–পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। যেমন গাড়ির সংখ্যা কমানো, হাঁটার দূরত্বে আরও বেশি সবুজ পার্ক তৈরি করা এবং আবাসিক এলাকার মাঝখান দিয়ে বড় রাস্তা বানানো বন্ধ করা। এতে পুরো এলাকার মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।
বিজ্ঞানীরা এখন এই গবেষণা আরও বড় পরিসরে করার পরিকল্পনা করছেন। অন্য বড় শহরের জন্যও এই সূচক ব্যবহার করা হবে। সেই সঙ্গে অতিরিক্ত গরম, দূষণ ও একাকিত্ব মিলে বয়স্ক মানুষদের মনে কী প্রভাব ফেলে, তা নিয়েও কাজ চলছে।
তাই রাস্তার কাঠামো শুধু ইট-পাথরের বিষয় নয়, এটি আমাদের মনেরও বিষয়। আমাদের এমন একটা শহর দরকার, যেখানে মানুষ একাকী না হয়ে বরং সবার সঙ্গে মিলেমিশে সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে।



