২০ বছর বয়সী মুর্শিদা আক্তার গত ৩ মে সকালে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেন। সেদিন ভোর ৫টায় স্বামী ও মামী শাশুড়িকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। চরের এবড়োখেবড়ো মেঠোপথ, খানাখন্দ, খাল ও ঝোপঝাড় পেরিয়ে সকাল সাড়ে ৮টায় পৌঁছান একটি ছোট্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেখানেই স্বাভাবিক প্রসবে জন্ম নেয় তার সন্তান।
মুর্শিদার অভিজ্ঞতা
মুর্শিদা বলেন, “এটা আমার দ্বিতীয় বাচ্চা। প্রথমবার শাহজাদপুর গিয়ে চেকআপ করাতে হতো। অনেক কষ্ট ছিল—নৌকা, বাইক, সিএনজি বদলাতে হতো। এবার অন্তত এত দূর যেতে হয়নি।” নরমাল ডেলিভারির স্বস্তির পাশাপাশি মাত্র ৪০০ টাকা খরচ হওয়ায় কিছুটা অবাকও হয়েছেন তিনি। যদিও তালিকায় ডেলিভারি চার্জ ৮০০ টাকা লেখা রয়েছে। তার কণ্ঠে ছিল স্বস্তির ছাপ।
মুর্শিদা জানান, এখানে যাদের নরমাল ডেলিভারি হয়েছে, তাদের কাছ থেকেই শুনেছেন অসচ্ছল পরিবারের কাছ থেকে যথাসম্ভব কম টাকা নেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, গর্ভধারণের পর থেকেই সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মীরা বাড়িতে গিয়ে তার চেকআপ করেছেন। গর্ভকালীন সময়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন, ওষুধও দিয়েছেন।
মুর্শিদা বলেন, “শুধু আমাকে না, সব গর্ভবতী নারীকেই তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই সেবা দেয়।”
চরাঞ্চলের নিরাপদ মাতৃত্ব
যমুনার বুকে জেগে ওঠা চর ঘোরজানের মানুষের কাছে ব্র্যাকের এই সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি এখন ‘নিরাপদ মাতৃত্বের’ সবচেয়ে বড় ভরসা। সন্তান প্রসবের পর বিকালে মোটরসাইকেলেই বাড়ি ফেরেন মুর্শিদা। আরেকটি বাইকে কোলে নবজাতককে নিয়ে ফেরেন তার মামী শাশুড়ি।
মুর্শিদার মামী শাশুড়ি জানান, এই সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র হওয়ার আগে প্রসবের জন্য শাহজাদপুর যেতে হতো। যাতায়াতের বাহন ছিল নৌকা, ট্রলার, সিএনজি ও মোটরবাইক। ডেলিভারির আগে এমন দীর্ঘ যাত্রা মা ও অনাগত সন্তানের জন্য ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, “এই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে গিয়ে বা ডেলিভারির সময় অনেকের মৃত্যুও হয়েছে।”
চৌহালী উপজেলার আসমা আক্তারও এসেছেন এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সন্তান প্রসব করাতে। তার স্বামী ঢাকায় চাকরি করেন। আসমা নিজেও স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় থাকেন। তবে সন্তান জন্মের সময় মায়ের সঙ্গে চলে এসেছেন ঘোরজান ইউনিয়নের ব্র্যাক সুস্বাস্থ্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে। আসমা জানান, বাবার বাড়িতে এসে খোঁজ নিয়েই তিনি জানতে পারেন এখানে নরমাল ডেলিভারির ব্যবস্থা রয়েছে। এর আগে এলাকায় এমন কোনও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছিল না।
দুর্গম চরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা চ্যালেঞ্জ
এই চরাঞ্চল মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। শাহজাদপুরের সোনাতনী ও চৌহালীর ঘোরজান ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে বাস অর্ধলক্ষাধিক মানুষের। অথচ নেই কোনও সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে প্রসব—সব চিকিৎসার জন্য মানুষকে যেতে হয় মূল ভূখণ্ডে। কারও গন্তব্য শাহজাদপুর, কারও এনায়েতপুর, কেউ যান টাঙ্গাইলের নাগরপুর বা পাবনার বেড়ায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পথটাই সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।
এখানে প্রসবের ব্যবস্থা বলতে ছিল মূলত দাদি-নানিদের অভিজ্ঞতা, হাতুড়ে ডাক্তারের ইনজেকশন আর ভাগ্যের ওপর ভরসা। সমস্যা দেখা দিলেই শুরু হতো জীবন-মৃত্যুর দৌড়—মোটরবাইক, নৌকা আর কাদামাটির সরু পথ পেরিয়ে। কখনও ঝোপঝাড়ের আড়ালে, কখনও নদীর মাঝখানে জন্ম নিয়েছে শিশু। আবার কখনও সন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখাতে গিয়ে মাকেই বেছে নিতে হয়েছে মৃত্যু।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১ লাখ জীবিত শিশু জন্মের ক্ষেত্রে ১২৩ জন মায়ের মৃত্যু হয়।
ব্র্যাকের উদ্যোগ
ঘোরজান এলাকার গর্ভবতী মায়েদের নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে ব্র্যাক চার্মস গড়ে তুলেছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র। কেন্দ্রটি চালু হয় ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর। প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস এই এলাকায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, গর্ভকালীন সেবা থেকে শুরু করে সাধারণ চিকিৎসা—সব ধরনের সেবাই চালু রয়েছে এখানে। সপ্তাহে একদিন মেডিকেল অফিসার বসেন। রয়েছে টেলিমেডিসিন সেবাও। অন্যান্য দিনে রোগী এলে ঢাকার চিকিৎসকদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলিয়ে দেওয়া হয়।
এই সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। এখানে প্রশিক্ষিত ধাত্রী, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, প্রসবসেবা, আলট্রাসনোগ্রাফি ও টিকাদান কার্যক্রম চালু রয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রটির আওতায় ৩৬০ জন প্রসূতি নারী নিয়মিত সেবা পাচ্ছেন। এখানে রয়েছেন সাতজন স্বাস্থ্যকর্মী, মিডওয়াইফ ও একজন প্রোগ্রাম অর্গানাইজার।
এ পর্যন্ত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৭০টি নরমাল ডেলিভারি সম্পন্ন হয়েছে। ব্র্যাক চার্মস প্রকল্পের পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, “এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল এমন এলাকা খুঁজে বের করা, যেখানে হাজার হাজার মানুষের বসবাস থাকলেও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা নেই। পরে মাঠপর্যায়ে যাচাই করে এই চরকে বেছে নেওয়া হয়।”
নৌকাচালকের সাক্ষ্য
চলতি মাসের ৩ তারিখ যাত্রাপথে কথা হয় নৌকাচালক আল আমিনের সঙ্গে। তিনি জানান, জরুরি অবস্থায় গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় চার থেকে পাঁচজন নারী নৌকাতেই সন্তান প্রসব করেছেন। আল আমিন বলেন, “যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে নৌকা পাড়ি দিয়ে শাহজাদপুরে পৌঁছাতে দেখেছি। চোখের সামনে তাদের কী পরিমাণ কষ্ট হতো, সেটা ভাষায় বলা যাবে না। এখন সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র হওয়ায় অনেক নারী নিরাপদে নরমাল ডেলিভারি করতে পারছেন।”
বাইকারের অভিজ্ঞতা
নদী পার হয়ে মোটরবাইকে যাওয়ার সময় কথা হয় বাইকার রাসেল রানার সঙ্গে। তিনি জানান, প্রথম সন্তানের জন্মের সময় বৃষ্টির মধ্যে স্ত্রীকে নিয়ে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে শাহজাদপুর যেতে হয়েছিল। রাস্তা ছিল পিচ্ছিল, কোথাও কোথাও পানিতে ডুবে ছিল। রাসেল বলেন, “অনেক কষ্ট করে বাইক আর নৌকায় নদী পার হয়ে হাসপাতালে যাই। পরে ডাক্তার বলেন, মেয়ের ব্রেনে কিছু সমস্যা আছে। প্রথম গর্ভধারণের পর আমার স্ত্রী কোনও চেকআপ করাননি। তখন যদি ঠিকভাবে চিকিৎসকের কাছে নিতে পারতাম, হয়তো বাচ্চাটা সুস্থ থাকত।”
বর্তমানে তার স্ত্রী ছয় মাসের গর্ভবতী। এবার আর সেই ভুল করতে চান না তিনি। গর্ভধারনের পর থেকেই স্ত্রীকে এই কেন্দ্রে নিয়মিত চিকিৎসা করাচ্ছেন। রাসেল আরও জানান, দুই বছর আগে এক গর্ভবতী নারীকে শহরে নেওয়ার পথে নদীঘাটে পৌঁছানোর আগেই প্রসববেদনা শুরু হয়। পরে ঝোপের মধ্যেই সন্তান প্রসব করতে হয় তাকে।
মিডওয়াইফের বক্তব্য
সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মিডওয়াইফ তাহরিমা খাতুন জানান, এখানে আসা বেশিরভাগ নারীরই বাল্যবিয়ে হয়েছে। অধিকাংশ গর্ভবতী নারীর বয়স ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। ফলে তাদের ঝুঁকিও বেশি। তিনি বলেন, “এখানকার অনেক মা অপুষ্টিতে ভোগেন। গর্ভকালীন পুষ্টি, ফলিক অ্যাসিড বা প্রয়োজনীয় ওষুধ সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। আমাদের মাঠকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসতে উৎসাহিত করেন।”
তিনি আরও জানান, বেশিরভাগ প্রসবই এখানে স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন হয়। জটিলতা দেখা দিলে রোগীদের খরচ দিয়ে শহরে পাঠানো হয় চিকিৎসার জন্য। প্রতিদিন গড়ে দুইজন গর্ভবতী নারী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন।
চিকিৎসকের মতামত
ব্র্যাক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. জান্নাতুল পিয়া বলেন, “গর্ভকালীন সময়ে বাইক বা ঘোড়ার গাড়িতে যাতায়াত খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময় পথেই ডেলিভারি হয়ে যায়। আবার ঝাঁকুনিতে শরীরের পানি ভেঙে গিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।” তিনি বলেন, “অনেক নারী বুঝতেই পারেন না যে তারা গর্ভবতী। আগে কবে ডেলিভারি হবে, বাচ্চার অবস্থান কী—এসব তাদের জানা থাকত না। এখন আলট্রাসনোগ্রাফি ও নিয়মিত চিকিৎসাসেবার কারণে মা ও শিশু দুজনই সুস্থ থাকছে এবং নরমাল ডেলিভারিও বাড়ছে।”
সিভিল সার্জনের প্রতিক্রিয়া
সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. নুরুল আমীন বলেন, “চরাঞ্চল এখনও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সেখানে হাসপাতালভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ।” তিনি বলেন, “অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেবার পরিধি এখনও পর্যাপ্ত নয়। তবে ভবিষ্যতে চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে একটি প্রস্তাবনাও জমা দেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে অন্তত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে সাব-সেন্টার স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।”



