চুলার গ্যাস বিস্ফোরণে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় দুর্ঘটনা: ১ জনের মৃত্যু, ১২ জন গুরুতর আহত
গ্যাস বিস্ফোরণে চট্টগ্রাম-ঢাকায় দুর্ঘটনা: মৃত্যু ও আহত

চুলার গ্যাস বিস্ফোরণে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় দুর্ঘটনা: ১ জনের মৃত্যু, ১২ জন গুরুতর আহত

বাড়ির সদস্যদের সামান্য অসতর্কতা চুলার গ্যাস রান্নাঘরে জমে ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে, তার মর্মান্তিক প্রমাণ মিলেছে চট্টগ্রামের হালিশহর ও রাজধানী ঢাকার রায়েরবাজারে। গ্যাস লিক থেকে সৃষ্ট বিস্ফোরণে মুহূর্তেই তছনছ হয়ে গেছে দুটি পরিবার, যেখানে চট্টগ্রামে ৯ জন দগ্ধ হয়েছে এবং তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে, আর ঢাকায় চারজন গুরুতর অবস্থায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

চট্টগ্রামের হালিশহরে বিস্ফোরণ: ৯ জন দগ্ধ, ১ জনের মৃত্যু

গত রবিবার দিবাগত ভোর রাতে হালিশহরের এসি মসজিদের পাশে ‘হালিমা মঞ্জিল’ ভবনের তৃতীয় তলায় এই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, রান্নাঘরে জমে থাকা গ্যাস থেকেই এই দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার লিটন কুমার পালিত সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের জানান, দগ্ধদের উন্নত চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতাল থেকে ঢাকায় জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।

ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পথে দগ্ধদের একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ ৯ জন হলো শাখাওয়াত হোসেন (৪৬), মো. শিপন (৩০), মো. সুমন (৪০), মো. শাওন (১৭), মো. আনাস (৭), উম্মে আইমন (৯), আয়েশা আক্তার (৪), পাখি আক্তার (৩৫) ও রানী আক্তার (৪০)। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. মকবুল।

চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, দগ্ধদের মধ্যে শাখাওয়াত হোসেন, পাখি আক্তার ও রানী আক্তারের শ্বাসনালির শতভাগ পুড়ে গেছে। মো. শিপনের শ্বাসনালির ৮০ শতাংশ পুড়েছে, মো. সুমন ও মো. শাওনের পুড়েছে ৪৫ শতাংশ। তিন শিশু মো. আনাস, উম্মে আইমন ও আয়েশা আক্তারের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। বার্নের ক্ষেত্রে শিশুদের ১০ শতাংশ ও প্রাপ্তবয়স্কদের ১৫ শতাংশের ওপরে গেলে অবস্থা আশঙ্কাজনক বিবেচনা করা হয়, এবং তাদের যে কোনো সময় আইসিইউ লাগতে পারে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের আগ্রাবাদ স্টেশনের অফিসার খান খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, চুলা থেকে গ্যাস লিক হয়েছিল, এতে রান্নাঘরে গ্যাস জমে যায়। এই গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ ঘটে পুরো ঘরে আগুন লেগে বাসার সবাই দগ্ধ হয়। পুরো বাড়িতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে ফায়ার সার্ভিসের দুটি স্টেশনের চারটি গাড়ি ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

সেহেরির আগমুহূর্তে রান্নাঘরে গ্যাস থেকে এই বিস্ফোরণ হয় বলে জানা গেছে। ঐ বাসায় আগে থেকেই দুই ভাই পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। কুমিল্লার বুড়িচং থেকে এক ভাইয়ের পরিবারের সদস্যরা এসেছিল চিকিৎসার প্রয়োজনে, তারাও দগ্ধ হয়েছেন। চট্টগ্রাম-১০ আসনের এমপি সাঈদ আল নোমান বলেন, এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্টদের ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে সার্বক্ষণিক তদারকি করা হয়েছে।

ঢাকার রায়েরবাজারে বিস্ফোরণ: ৪ জন আইসিইউতে

রাজধানীর হাজারীবাগ থানাধীন রায়েরবাজার এলাকার আরেকটি বাসায়ও গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের শিশুসহ চারজন আগুনে দগ্ধ হয়েছেন। দগ্ধরা হলেন, শেখ নোমান (৩৫), পিংকি আক্তার (৩২), দম্পতির ছেলে রোহান (৩) ও শেখ নোমানের শ্যালক অপু (২৩)। গত রবিবার রাত পৌনে ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে দগ্ধ অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।

বর্তমানে তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। মো. মামুন নামে ঐ পরিবারের প্রতিবেশী জানান, হাজারীবাগে রায়েরবাজার জাহানারা ভিলার ছয় তলার নিচতলায় ভাড়া বাসায় এই বিস্ফোরণের পর আগুন গেলে লেগে যায়। শেখ নোমান নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী থানার মোহাম্মদপুর এলাকার শেখ গোলাম মাওলার ছেলে, বর্তমানে রায়েরবাজারে ১৪৭ নম্বর জাহানারা ভিলার ছয় তলার নিচতলায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান জানান, বিস্ফোরণে নোমানের শরীর ৭০ শতাংশ, তার স্ত্রী পিংকি আক্তার ৭৫ শতাংশ, ছেলে রোহান ৩৫ শতাংশ ও তার শ্যালক অপুর ৫০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। সবাইকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে এবং প্রত্যেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।

গ্যাস নিরাপত্তায় সতর্কতা জরুরি

এই দুটি ঘটনা গ্যাস ব্যবহারে নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রান্নাঘরে গ্যাস লিক হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিয়মিত চুলা ও পাইপলাইন পরীক্ষা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত সাড়া ও চিকিৎসা সহায়তা সত্ত্বেও, এই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।

চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান চিকিৎসক রফিক উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, দগ্ধদের সবারই শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সবার অবস্থাই আশঙ্কাজনক। হালিশহর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাজেদুল ইসলাম জানান, বিস্ফোরণে তৃতীয় তলার বাসাটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, এবং পুরো ভবনটিতে ১০-১২টি ফ্ল্যাটের সবগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই দুর্ঘটনাগুলো গৃহস্থালি নিরাপত্তার দিকে নজর দিতে বাধ্য করছে, যেখানে সামান্য অসতর্কতা জীবনঘাতী পরিণতি ডেকে আনতে পারে।