ডেলটা হাসপাতালে নবজাতক বদলের অভিযোগ, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কবর থেকে লাশ তোলা হবে
ডেলটা হাসপাতালে নবজাতক বদলের অভিযোগ, ডিএনএ পরীক্ষা

ডেলটা হাসপাতালে নবজাতক বদলের অভিযোগ, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কবর থেকে লাশ তোলা হবে

ঢাকার ডেলটা হেলথকেয়ার যাত্রাবাড়ী লিমিটেড হাসপাতালে নবজাতকের মৃত্যু নিয়ে তীব্র অভিযোগ উঠেছে। মা ইয়াসমিন ফেরদৌসি রিমা দাবি করেছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অন্য একটি মৃত শিশু পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ডিএনএ পরীক্ষার জন্য শিশুটির লাশ কবর থেকে তোলা হবে।

ঘটনার সূত্রপাত

ইয়াসমিন ফেরদৌসি রিমা গত ২৬ ডিসেম্বর রাত ১১টার দিকে একটি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। জন্মের পর শিশুটির শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে ডেলটা হেলথকেয়ার যাত্রাবাড়ী লিমিটেডে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের বিশেষ পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) শিশুটিকে পর্যাপ্তভাবে দেখতে না দেওয়ার অভিযোগ করেন মা। দুই দিন পর ২৯ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে শিশুটি মারা যায়।

সন্দেহের উদ্রেক

হাসপাতাল থেকে মৃত্যুসনদে শিশুটির পরিচিতি ‘সন অব রিমা’ বা রিমার ছেলে হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে দাফনের পর পরিবারের কাছে থাকা ছবি ও ভিডিও দেখে ইয়াসমিন ফেরদৌসির মনে সন্দেহ জাগে। তিনি লক্ষ্য করেন, তাঁর ছেলের নাভি শুকিয়ে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না, যা সাধারণত এত কম সময়ে ঘটে না। এছাড়া, হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজেও গরমিল দেখা যায় বলে দাবি করেন তিনি।

মামলা ও তদন্ত

এই অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৩ জানুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় ডেলটা হেলথকেয়ারের এনআইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. মুজিবর রহমান, হাসপাতালের ব্যবস্থাপকসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে অপরাধের প্রমাণ গোপন করা এবং প্রতারণা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলাটি তদন্ত করছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক শাকিল হোসেন জানান, হাসপাতাল থেকে সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্য লাশ কবর থেকে তোলা এবং পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আদালত গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার দিন ধার্য করেছিল, যা পরে ২৪ ফেব্রুয়ারি পিছিয়ে দেওয়া হয়।

হাসপাতালের বক্তব্য

ডেলটা হেলথকেয়ারের চিকিৎসক অধ্যাপক মুজিবর রহমান অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মৃত নবজাতকের পরিবারের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। বাচ্চা হস্তান্তরের সময় অভিযোগ না করে অনেক পরে অভিযোগ করেছে পরিবারটি।’ হাসপাতালের ব্যবস্থাপক সুলতান আহমেদ দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করার জন্য কেউ পরিবারটিকে প্রভাবিত করে মামলা করাতে পারে।

পরিবারের পক্ষের যুক্তি

ইয়াসমিন ফেরদৌসির স্বামী মো. শাহিন জানান, হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ২৮ ডিসেম্বর রাত ১০টা ৫৭ মিনিটে তাদের ছেলের নির্ধারিত বিছানায় সে ছিল না। রাত ১১টা ৩৬ মিনিটে অন্য একটি নবজাতককে ওই বিছানায় দেখা যায়। পরদিন ওই পাল্টে দেওয়া নবজাতককেই পরিবারের কাছে মৃত অবস্থায় হস্তান্তর করা হয় বলে তাদের দাবি।

আইনজীবী সিরাজুল হক ফয়সাল, যিনি পরিবারকে আইনি সহায়তা দিচ্ছেন, তিনি বলেন, ছবিতেই স্পষ্ট যে শাহিন ও ইয়াসমিন ফেরদৌসির সন্তান বেশ ছোট ছিল এবং মৃত বাচ্চা তুলনামূলক বড় ছিল। নাভির বিষয়টিও সন্দেহজনক। হাসপাতালের ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, একজন নার্স নবজাতকটিকে কোথাও নিয়ে যান এবং দীর্ঘ সময় পরে অন্য নবজাতককে বিছানায় রেখে যান।

আইনি প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ

ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল এবং তদন্ত প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে আদালত চূড়ান্ত রায় দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। অধ্যাপক মুজিবর রহমান বলেন, শিশুটির ডিএনএ টেস্টসহ অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ায় সত্যটা বের হয়ে আসবে। পরিবারটি ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় রয়েছে, যেখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইনি প্রক্রিয়াকে মেনে নেওয়ার কথা বলেছে।

এই ঘটনা স্বাস্থ্য খাতের তদারকি ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব তুলে ধরেছে, বিশেষ করে নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে। ঢাকার মতো বড় শহরে এরকম অভিযোগ জনসাধারণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানানো হচ্ছে।