গাইবান্ধার মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবকের ওপর মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ
গাইবান্ধা শহরের জিইউকে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে মুর্শিদ হক্কানী (৩৭) নামের মানসিক ভারসাম্যহীন যুবকের ওপর মারধর ও নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নির্যাতনের শিকার যুবকের বড় ভাই আওরঙ্গ হক্কানী বাদী হয়ে শনিবার বিকালে গাইবান্ধা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগে উল্লিখিত পাঁচ ব্যক্তির নাম
লিখিত অভিযোগে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত পাঁচ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন- জিইউকে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাঁধন (৩৫), লাবিব (৩২), সিয়াম (৩৫), আতিক (৩৬) ও তালহা (৩৫)। অভিযোগপত্রে সবার পরিচয় ও ঠিকানা অজ্ঞাত দেখানো হয়েছে।
চিকিৎসার নামে ভর্তি ও পরবর্তী ঘটনা
লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, মুর্শিদ হক্কানী গত বছরের ২৮ আগস্ট শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে শহরের ভি-এইড রোডে অবস্থিত গাইবান্ধার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (জিইউকে) পরিচালিত ‘জিইউকে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে’ চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা চলাকালে কেন্দ্রের দায়িত্বরত ব্যক্তিরা প্রথমে পরিবারের লোকজনকে তার খোঁজখবর নিতে দেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অজুহাতে রোগীর সঙ্গে কথাবার্তা ও দেখাসাক্ষাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সর্বশেষ ১১ ফেব্রুয়ারি বেলা ২টার সময় আত্মীয়স্বজন মুর্শিদ হক্কানীর সঙ্গে স্বাক্ষাৎ করতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকেন। দীর্ঘ সময় পর পুনরায় অনুরোধ করলে বিকাল ৩টার দিকে মুর্শিদ হক্কানীকে দেখার সুযোগ দেন এবং তাদের প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা করাবেন না মর্মে জানান। এ সময় মুর্শিদ হক্কানীর নাকের ওপরসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাটা, ছেলা-ফোলা ও আঘাত-জখমের চিহ্ন দেখা যায়।
নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা
পরে কেন্দ্রের পাওনা পরিশোধ করে মুর্শিদকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। বাড়িতে গিয়ে মুর্শিদ হক্কানী কেন্দ্রের ভেতরে থাকা অবস্থায় তার ওপর শারীরিক নির্যাতন ও মারধরের বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাকে কেন্দ্রের একটি আধা পাকা ঘরের নিয়ে মুখে কাপড় ঢুকিয়ে লোহার রড দিয়ে ডান ও বাঁ হাতে, পিঠে, দুই ঊরুতে, দুই পায়ের হাঁটুতে, নাকের ওপর, বাঁ হাতের তালুতে মারধর করতেন। একপর্যায়ে তারা মুর্শিদের দুই পা রশি দিয়ে বেঁধে উল্টা করে গ্রিলে ঝুলিয়ে রাখেন। এতে মুর্শিদ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। মারধরের পর এসব কথা পরিবারকে না জানানোর জন্য হুমকি দেওয়া হয়।
অসুস্থ মুর্শিদ হক্কানীকে ১১ ফেব্রুয়ারি বিকালে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য
ভুক্তভোগী মুর্শিদ হক্কানীর বড় ভাই আওরঙ্গ হক্কানী বলেন, ‘ছোট ভাইকে সুস্থ করার জন্য ওই কেন্দ্রে রেখেছিলাম। কিন্তু উল্টো তাকে নৃশংসভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। ফলে তার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেছে। বর্তমানে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং চিকিৎসা চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই ঘটনায় আমরা বিচার চেয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছি। তবে এখন পর্যন্ত পুলিশ কোনও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। আমরা সঠিক ও দ্রুত বিচার চাই।’
পুলিশ ও কেন্দ্র প্রধান কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, ভুক্তভোগীর ভাই থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মুর্শিদ হক্কানীকে নির্যাতনের ভিডিও গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী এম আবদুস সালামের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে তাকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। তিনি হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া খুদে বার্তায় জানান, ‘আমি খুবই অসুস্থ, চার দিন থেকে, তবু দেখছি। খুবই দুঃখজনক। কারা এ রকম করলো, আমি এখনই ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
এই ঘটনা গাইবান্ধা শহরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত বিচার ও জবাবদিহিতা দাবি করছেন। স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে এমন নির্যাতনের অভিযোগ মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
