হামের জটিলতায় তিন বছরের শিশু সাদমানের মৃত্যু, মায়ের আক্ষেপে ফেসবুক আলোচিত
হামে শিশু সাদমানের মৃত্যু, মায়ের আক্ষেপে ফেসবুক আলোচিত

হামের জটিলতায় তিন বছরের শিশু সাদমানের মৃত্যু, মায়ের আক্ষেপে ফেসবুক আলোচিত

হামসহ নানা জটিলতার কাছে হার মানতে হয়েছে তিন বছর বয়সী শিশু সাদমান আলীকে। শিশুটির মরদেহ চাদরে ঢেকে বাড়ির পথে এক স্বজনের কোলে নিয়ে যাওয়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। রাজধানীর মহাখালী এলাকা থেকে মঙ্গলবার এই ছবি তুলেছেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ ফটোসাংবাদিক খালেদ সরকার।

ছবিটি দেখে কেউ স্বাভাবিক থাকতে পারছেন না

রাজধানীতে তপ্ত দুপুরে ব্যস্ত সড়কে এক স্বজনের কোলে চাদরে মোড়ানো সাদমানের মরদেহের ছবিটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। এই ছবি দেখার পর অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে, শিশুটি দেখতে কেমন ছিল? সে বাসায় কী করত? সাদমানের বাবা মোহাম্মদ সজীবের ফেসবুক প্রোফাইলে একটি ছবি চোখে পড়ে। সাদা জমিনে কারুকাজ করা পাঞ্জাবি পরে সাদমান মিষ্টি করে হাসছে, কপালে বড় একটি কালো নজরটিপ। ছবিটি গত ঈদের দিনের।

সাদমানের মা আফসিন মীম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি তো মা। ছেলে যখন বাইরে যেত বা আমার চোখে ছেলেকে দেখতে খুব সুন্দর লাগত, তখন নজরটিপ দিয়ে দিতাম, যাতে নজর না লাগে। সেই তো নজরই লাগল।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাদমান আলী ছিল সজীব-মীম দম্পতির একমাত্র ছেলে

সজীব স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছিলেন, ‘আমার পৃথিবী’। শিশু সাদমানের চাদরে ঢাকা ছবিটি গত মঙ্গলবার তুলেছিলেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ আলোকচিত্রী খালেদ সরকার। ফেসবুকে ঘুরতে থাকা ছবিটি সাদমানের মা–বাবাও দেখেছেন। বাবা প্রথম আলোর ছবি ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে লিখেছেন, ‘আহা, আমার বাচ্চারে, কই গেলি রে, আমারে ছাইড়া।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হামে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে, এই আশায় ভর্তি

হামে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে, এই আশায় ১৬ এপ্রিল সাদমানকে ভর্তি করা হয়েছিল রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে। কিন্তু হামসহ নানা জটিলতায় সাদমান কামরাঙ্গীরচরের বাসায় ফিরেছে লাশ হয়ে। হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় সে মারা যায়।

গতকাল বুধবার মুঠোফোনে কথা হয় সাদমানের মা আফসিন মীমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ফেসবুকজুড়ে শুধু আমার বাবুর ছবি। মন চায় না এ ছবি দেখতে, তার পরও চোখের সামনে আসছেই।’

মা ইনজেকশন এনে দেখেন, ছেলে আর নেই

হামের প্রকোপ বাড়তে থাকায় বাড়তি সতর্কতা হিসেবে সাদমানকে আশপাশের অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে সেভাবে মিশতেও দিতেন না বলে জানালেন আফসিন। বললেন, মারা যাওয়ার আগমুহূর্তে তিনি ছেলের জন্য ইনজেকশন কিনতে হাসপাতালের নিচে নেমেছিলেন। ইনজেকশন নিয়ে ফিরে দেখেন, সে তার নানির কোলে। বড় চিকিৎসক এসে ছেলের বুকে-পেটে চাপ দিচ্ছিলেন; কিন্তু বাবু নড়ে না, চোখ বন্ধ। তারপর এক চিকিৎসক সাদমানকে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। সেকেন্ডের মধ্যে কী যে হয়ে গেল! ইনজেকশনটা দেওয়ারও সময় দিল না!

আফসিনের কত কথা যে মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘জানেন, আমার ছেলেটা খুব চঞ্চল ছিল। ওর দুষ্টুমিতে অনেকেই বিরক্ত হয়ে যেত। সেই ছেলে একদম চুপ হয়ে গেল।’

‘সাদমান সেভাবে গুছিয়ে কথা বলতে পারত না। বাবা, মা, নানা...এমন শব্দগুলো বলত। আহা... ছেলেটা যদি কথা বলতে পারত, তাহলে মারা যাওয়ার আগে ওর কোথায় কষ্ট হচ্ছিল বলতে পারত’ আক্ষেপ করে বললেন মা। জানালেন, ছেলেটা ললিপপ ও আইসক্রিম পছন্দ করত, বাবার সঙ্গে ভাব বেশি ছিল, বাবাকে ছাড়া কিছুই বুঝত না। মারা যাওয়ার পর থেকে ছেলের বাবা একদম চুপ হয়ে গেছেন। কারও সঙ্গে তেমন একটা কথাও বলছেন না।

প্রথমে জ্বর হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়

প্রথমে জ্বর হলে সাদমানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসক দেখে নাপা দেন। পরের দিন আবার নেওয়া হলে কিছু পরীক্ষা করাতে দেন। সব দেখে চিকিৎসক শরীরে র‍্যাশ ওঠে কি না, খেয়াল রাখতে বলেন। শরীরে র‍্যাশ দেখা দিলে মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে নেওয়ার কথাও লিখে দেন।

আফসিন বলেন, ‘ছেলের শরীরে দু–একটা র‍্যাশ দেখা দেয়। রাতে মশারি টানাই না। প্রথমে ভাবি, মশার কামড় মনে হয়। তার পরও ছেলের বাবাকে ইউটিউবে সার্চ দিতে বলি। তখন বুঝতে পারি, ছেলেকে নিয়ে আর বাসায় থাকা যাবে না। তারপর হাসপাতালে ভর্তি করি।’

অনেকে ভেবেছিলেন, সাদমানের মরদেহ নিয়ে যিনি হাঁটছিলেন, তিনি ওর বাবা

এ প্রসঙ্গে আফসিন বলেন, উনি তাঁর ভাগনি জামাই। ছেলেটি মারা যাওয়ার পর কারও মাথা ঠিক ছিল না। অ্যাম্বুলেন্স কতক্ষণে পাওয়া যাবে ঠিক নেই। তাই সিএনজি খুঁজছিলেন। হাসপাতালের সামনে সিএনজি না পেয়ে ফুটওভার ব্রিজ (পদচারী–সেতু) পার হয়ে সড়কের অন্য পাশে গেলে সিএনজি পাওয়া যায়। ওই সময় ছবিটি তোলেন এক সাংবাদিক।

‘অনেক আশা নিয়ে হাসপাতালে গেছিলাম’

আফসিন আবার আক্ষেপ করেন। বলেন, ‘মারা যাওয়ার আগের রাতে বারবার ছেলে মুখের অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলছিল। অনেক কাশতেছিল। একবার বসাই, আবার শুইয়ে দিই। মাম মাম করে পানি খেতে চায়। ওর মধ্যে অশান্তি হচ্ছে, কিন্তু কোথায় কষ্ট তা বলতে পারে নাই। আমার ছেলেটা অস্থির হয়ে যাচ্ছিল; কিন্তু নার্স কাছে আসে নাই।’

সাদমানের বাবা কামরাঙ্গীরচরে একটি মার্কেটে চাকরি করেন। আফসিন একজন উদ্যোক্তা, অনলাইনে পণ্য বিক্রি করেন। ছেলের চিকিৎসায় কত খরচ হয়েছে সে হিসাব করেননি এখনো। বলেন, ‘আমরা মধ্যবিত্ত। হাসপাতালে সব ওষুধই বলতে গেলে কিনতে হইছে।’

আফসিনের কণ্ঠে ক্ষোভের মাত্রা বাড়তে থাকে। তিনি বলেন, ‘আমরা তো অনেক আশা নিয়ে হাসপাতালে গেছিলাম। ছেলের জ্বর বাড়তে বাড়তে ১০৬ ডিগ্রি হয়ে যায়। জ্বর কমে না কেন জানতে চাইলে ডাক্তাররা ধমক দেন। বলেন, শরীর মুছায় দেন। হাসপাতালে এত অবহেলা...! শত শত মা–বাবার বুক খালি হচ্ছে। হাসপাতালে গিয়ে বাবুরা ভালো হচ্ছে না কেন? সরকার কী করছে?’