রক্তদান একটি নিরাপদ ও জীবনরক্ষাকারী মানবিক উদ্যোগ। অস্ত্রোপচার, দুর্ঘটনা, প্রসবজনিত জটিলতা কিংবা বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় রক্তের বিকল্প নেই। তবু অনেকের, বিশেষ করে প্রথমবার রক্তদান করতে যাওয়া ব্যক্তিদের মনে রক্ত দেওয়ার পর শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকে।
রক্তদানের পর দ্রুত পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে কৈলাশ দীপক হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. রজত কান্ত জাইন জানিয়েছেন, রক্তদানের পর মানবদেহ অত্যন্ত দ্রুত নিজেকে পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করে। তার ভাষ্য, রক্ত দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শরীর হারানো তরল ও রক্তকণিকার ঘাটতি পূরণের প্রক্রিয়া চালু করে।
অধিকাংশ সুস্থ মানুষ ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই স্বাভাবিক অনুভব করেন। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে সাময়িক ক্লান্তি বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যা পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পানি পান এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের মাধ্যমে সহজেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
প্রথম ২৪ ঘণ্টায় প্লাজমা পুনরুদ্ধার
বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তদানের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে দ্রুত পূরণ হয় রক্তের তরল অংশ বা প্লাজমা। শরীরের বিভিন্ন টিস্যু থেকে তরল রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে রক্তের স্বাভাবিক পরিমাণ বজায় রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে লসিকাতন্ত্র জমে থাকা তরল ও প্রোটিন আবার রক্তে ফিরিয়ে আনে। এ সময় কিডনি শরীরে পানি ধরে রাখে এবং তৃষ্ণার অনুভূতি বাড়িয়ে দেয়, যাতে রক্তদাতা বেশি তরল গ্রহণ করেন। অন্যদিকে লিভার ধীরে ধীরে অ্যালবুমিনসহ প্রয়োজনীয় প্লাজমা প্রোটিন তৈরি করে, যদিও এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে এক দিনের বেশি সময় লাগতে পারে।
লোহিত রক্তকণিকা ও অন্যান্য উপাদান পুনর্গঠন
প্লাজমার ঘাটতি দ্রুত পূরণ হলেও লোহিত রক্তকণিকা আগের অবস্থায় ফিরতে কয়েক সপ্তাহ সময় নেয়। তবে অনুচক্রিকা ও শ্বেত রক্তকণিকার পুনর্গঠন তুলনামূলক দ্রুত শুরু হয়। অস্থিমজ্জা নতুন কোষ উৎপাদন শুরু করে এবং কয়েক দিন থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে এগুলোর মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এ কারণেই অধিকাংশ রক্তদাতা অল্প সময়ের মধ্যেই দৈনন্দিন কাজকর্মে ফিরতে পারেন।
মাথা ঘোরা ও ভ্যাসোভ্যাগাল রিফ্লেক্স
চিকিৎসকদের ভাষ্য, রক্ত দেওয়ার পর কিছু মানুষের মাথা হালকা লাগা বা মাথা ঘোরা স্বাভাবিক ঘটনা। এটি মূলত রক্তের পরিমাণ সাময়িক কমে যাওয়া এবং ‘ভ্যাসোভ্যাগাল রিফ্লেক্স’-এর কারণে ঘটে। এ সময় ভেগাস স্নায়ুর প্রভাবে হৃদস্পন্দন কিছুটা ধীর হয়ে যায় এবং রক্তনালি প্রসারিত হওয়ায় মস্তিষ্কে সাময়িকভাবে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে। বিশেষ করে প্রথমবার রক্তদানকারী, কম ওজনের ব্যক্তি, যাদের শরীরে পানির ঘাটতি রয়েছে, যারা না খেয়ে রক্ত দেন, পর্যাপ্ত ঘুমাননি বা যাদের রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবেই কম—তাদের মধ্যে এ ধরনের উপসর্গ বেশি দেখা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত পানি পান, হালকা খাবার গ্রহণ এবং কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব সমস্যা দূর হয়ে যায়। রক্তদানের পর শরীরের হৃৎপিণ্ড, কিডনি, লিভার, অস্থিমজ্জা, স্নায়ুতন্ত্র ও লসিকাতন্ত্র একযোগে কাজ করে হারানো রক্তের উপাদানগুলো পুনর্গঠন করে। পরবর্তী সময়ে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার ও সুষম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে লোহিত রক্তকণিকার ঘাটতিও ধীরে ধীরে পূরণ হয়ে যায়। তাই চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ ব্যক্তির জন্য রক্তদান একটি নিরাপদ প্রক্রিয়া এবং সাময়িক কিছু পরিবর্তন ছাড়া এটি শরীরের দীর্ঘমেয়াদি কোনো ক্ষতি করে না।



