বন্যায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয়: ডা. সি. এম. শামীম কবীরের পরামর্শ
বন্যায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয়: ডা. শামীম কবীর

বন্যা দেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার পরিবার। বন্যা দুর্গতরা স্বাস্থ্যকর খাবার, সুপেয় পানি ও ন্যূনতম থাকার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বন্যার সময় কিছু রোগ-বালাই দেখা দেয়, যা মোকাবিলায় সতর্ক ও সচেতন থাকা জরুরি।

বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিতকরণ

বন্যার সময় পানি দূষিত হওয়ায় তা ভালোভাবে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করতে হবে এবং গৃহস্থালির কাজেও ব্যবহার করতে হবে। টিউবওয়েল তলিয়ে গেলে এক কলস পানিতে তিন-চার চা চামচ ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে টিউবওয়েলের ভেতরে ঢেলে আধা ঘণ্টা রেখে তারপর একটানা আধা ঘণ্টা চেপে পানি বের করে ফেলতে হবে। ব্লিচিং পাউডার না থাকলে এক ঘণ্টা টিউবওয়েলের পানি চেপে বের করে ফেলতে হবে। তবে নিরাপত্তার জন্য টিউবওয়েলের পানিও ভালোভাবে ফুটিয়ে নেওয়া উচিত; পানি একটানা ৩০ মিনিট ফুটিয়ে ঠান্ডা করতে হবে। পানি ফোটানোর ব্যবস্থা না থাকলে প্রতি দেড় লিটার পানিতে ৭.৫ মিলিগ্রাম হ্যালোজেন ট্যাবলেট, তিন লিটার পানিতে ১৫ মিলিগ্রাম এবং ১০ লিটার পানিতে ৫০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা রেখে দিলে পানি বিশুদ্ধ হয়। বাসার পানির ট্যাংকের প্রতি এক হাজার লিটার পানিতে ২৫০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডার এক ঘণ্টা রাখলেও পানি বিশুদ্ধ হয়, তবে এতে ভাইরাস জীবাণু ধ্বংস হয় না।

ডায়রিয়া প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

বন্যার প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যা হলো ডায়রিয়া। খাওয়ার আগে ও পায়খানার পর হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। ডায়রিয়া শুরু হলে পরিমাণমতো খাওয়ার স্যালাইন খেতে হবে। দুই বছরের কম শিশুকে প্রতি পাতলা পায়খানায় ১০-১২ চা চামচ এবং ২ থেকে ১০ বছরের শিশুকে ২০-৪০ চা চামচ স্যালাইন দিতে হবে। স্যালাইন না থাকলে লবণ-গুড়ের শরবত, ভাতের মাড়, চিঁড়ার পানি, ডাবের পানি বা নিরাপদ পানি খাওয়ানো যেতে পারে। শিশুর পুষ্টিহীনতা রোধে খিচুড়ি ও ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া যেতে পারে। পাতলা পায়খানা ও বমি বেড়ে গেলে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

খাবার গ্রহণে সতর্কতা

বন্যার সময় পচা-বাসি খাবার গ্রহণে ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগ ছড়িয়ে পড়ে। খিচুড়ি এ সময় স্বাস্থ্যোপযোগী। খাবার প্লেট সাবান ও নিরাপদ পানি দিয়ে ধুতে হবে। অনেকে পানি বাঁচাতে প্রথমে স্বাভাবিক পানিতে থালা-বাসন ধুয়ে পরে ফুটানো পানিতে ধুয়ে নেন, কিন্তু এটি ঠিক নয়, কারণ এতে থালা-বাসনে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে।

দুর্ঘটনা থেকে সাবধানতা

বন্যার সময় বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা, ডুবে যাওয়া, সাপ ও পোকা-মাকড়ের কামড় বেশি ঘটে। বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে গেলে বা পানিতে পড়ে থাকলে তা স্পর্শ না করে বিদ্যুৎ কর্মীদের খবর দিতে হবে। সাপ ও ইঁদুর তাদের আবাস হারিয়ে শুকনো স্থানে মানুষের সঙ্গে অবস্থান নেয়, ফলে কামড়ের ঘটনা বাড়ে। বিষহীন সাপে কাটলে ভয়ের কিছু নেই। বিষধর সাপে কাটলে কামড়ের স্থানের সামনে মোটা কাপড় বা রশি দিয়ে গিঁট দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে, যেখানে অ্যান্টিভেনম ও টিটেনাস প্রতিষেধক দিতে হবে। ইঁদুরে কাটলেও ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

মলত্যাগে সতর্কতা

বন্যার সময় যেখানে-সেখানে মলত্যাগ করা উচিত নয়, এতে পেটের পীড়া ও কৃমির সংক্রমণ বাড়ে। নির্দিষ্ট স্থানে মলত্যাগ করে সাবান বা ছাই দিয়ে হাত ধুতে হবে। খালি পায়ে মলত্যাগ করলে বক্রকৃমির জীবাণু শরীরে সংক্রমিত হতে পারে। বাসার সবাইকে কৃমির ওষুধ খাওয়ানো উচিত; দুই বছরের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

বন্যা-পরবর্তী সতর্কতা

বন্যা-পরবর্তী সময়ে মানুষ (২ বছরের নিচের শিশু ছাড়া) ও গবাদিপশুকে কৃমিনাশক খাওয়াতে হবে। শামুক বিভিন্ন পরজীবীর মধ্যবর্তী পোষক, এগুলো হাঁসের খাবার হিসাবে ব্যবহার বা নিধন করতে হবে। কৃমিনাশক ওষুধ নিয়মিত চার থেকে ছয় মাস অন্তর খাওয়াতে হবে।

লেখক: ডা. সি. এম. শামীম কবীর, মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, উত্তরা, ঢাকা।