বাংলাদেশ মূলত তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত— ইউরেশিয়ান প্লেট, ইন্ডিয়ান প্লেট এবং বার্মা প্লেট। তাই এ দেশে যে ভূমিকম্প মাঝেমধ্যে হবে, সেটাকে স্বাভাবিক বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, সম্প্রতি দেশের মধ্যে ভূমিকম্পের উৎপত্তির প্রবণতা বেড়েছে।
সম্প্রতি উত্তরাঞ্চলে মৃদু ভূমিকম্প
আজ শনিবার (৯ মে) দেশের উত্তরাঞ্চলে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। বিকাল ৩টা ১০ মিনিটে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (এনসিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৫। ভারতের স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে আসামে এর উৎপত্তি হয়।
ভূমিকম্পে করণীয়: ফায়ার সার্ভিসের নির্দেশনা
এমন অবস্থায় প্রশ্ন এসেছে, ভূমিকম্পের সময় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে করণীয় নিয়ে। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য বলছে, ভূমিকম্পের সময় সঠিক পদক্ষেপ নিলে প্রাণহানি ও ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তবে যে সতর্কতাগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেনে চলতে হবে সেগুলো হলো:
- শান্ত ও স্থির থাকা: ভূকম্পন অনুভূত হলে আতঙ্কিত না হয়ে স্থির থাকা। ভবনের নিচতলায় থাকলে দ্রুত বাইরে বের হয়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নেওয়া।
- ড্রপ কভার হোল্ড পদ্ধতি: বহুতল ভবনে থাকলে নিচু হয়ে শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে ঢুকে খুঁটি শক্ত করে ধরা। অথবা কলামের পাশে, বিমের নিচে আশ্রয় নেওয়া। সম্ভব হলে বালিশ, কুশন বা এ জাতীয় বস্তু দিয়ে মাথা ঢেকে রাখা।
- লিফট ব্যবহার না করা: ভূমিকম্প চলাকালীন কখনও লিফট ব্যবহার করা যাবে না। ভূমিকম্প থামার পর দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করা।
- ঝুঁকিপূর্ণ জিনিস থেকে দূরে থাকা: বারান্দা, ব্যালকনি, জানালা, বুকশেলফ, আলমারি, ফ্যান বা ঝুলন্ত ভারী বস্তু থেকে দূরে থাকা। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস (টর্চ, হেলমেট, জরুরি ওষুধ, বাঁশি) হাতের কাছে রাখা।
- বাইরে থাকলে: খোলা স্থানে আশ্রয় নেওয়া। গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি, উঁচু ভবন বা দেওয়ালের পাশে না দাঁড়ানো।
- গাড়িতে থাকলে: নিরাপদ স্থানে থামা। ওভারব্রিজ, ফ্লাইওভার, গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে দূরে গাড়ি থামানো। ভূকম্পন থামা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরেই থাকা।
- আফটারশকের প্রস্তুতি: আবারও ভূমিকম্প হতে পারে। একটি ভূমিকম্পের পর আফটারশক হওয়া স্বাভাবিক। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, ব্রিজ বা দুর্বল স্থাপনার কাছে না যাওয়া। এগুলো ভেঙে পড়তে পারে।
সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সুরক্ষা নিশ্চিত করে উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিস বলেছে, সবার দায়িত্বশীল আচরণেই বড় ক্ষতি কমানো সম্ভব। জরুরি প্রয়োজনে সংস্থার হটলাইন নম্বর ১০২ এ যোগাযোগ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।
বিশেষজ্ঞদের ৩ ধাপের পরামর্শ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার এবং ভূতাত্ত্বিক সমিতির সভাপতি বদরুল ইমাম ভূমিকম্প মোকাবিলায় তিনটি পর্যায়ের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।
প্রথম ধাপ (পূর্বপ্রস্তুতি)
ভূমিকম্পের আগেই পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সুরক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ এবং নিরাপদ স্থান চিহ্নিত করা।
দ্বিতীয় ধাপ (কম্পনকালীন সুরক্ষা)
ভূমিকম্প চলাকালে ইনডোর বা আউটডোরে যেখানেই থাকুক না কেন, বাসস্থান, অফিস-আদালত কিংবা রাস্তা (ইনডোর বা আউটডোর) যেখানেই হোক, কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হবে তার সম্যক জ্ঞান থাকা।
তৃতীয় ধাপ (পরবর্তী উদ্ধারকাজ)
কম্পন থামার পর নাগরিক হিসেবে উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণ এবং কমিউনিটির সঙ্গে মিলে কাজ করা।
ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার মনে করেন, তরুণ সমাজকে সচেতন করতে ‘ন্যাচারাল ডিজাস্টার সারভাইভাল গেম’-এর মতো ডিজিটাল মাধ্যম ও নিয়মিত মহড়া কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, ‘এর মাধ্যমে তরুণ সমাজকে অনুপ্রাণিত করা সম্ভব এবং নিয়মিত মহড়া ও অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষের মানসিক মনোবল বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত জানমালের ক্ষয়ক্ষতি নূন্যতম পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সাহায্য করবে।’



