সাড়ে চার বছরের তাসফিয়া আকতার হামের উপসর্গ নিয়ে গত শুক্রবার রাত ১০টায় ভর্তি হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। তার শরীরের রেশসহ উপসর্গ দেখে চিকিৎসকরা হাম হিসেবে সন্দেহ করেন। এজন্য ভর্তি করা হয় হাসপাতালের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে। পরবর্তীতে পরীক্ষায়ও তার হাম শনাক্ত হয়। বর্তমানে এই শিশুর চিকিৎসা হচ্ছে হাসপাতালের নিচতলায় অবস্থিত ‘হাম ওয়ার্ডে’।
হাম ওয়ার্ডে শয্যা সংকট
বাস্তবতা হলো হাম ওয়ার্ডে এখন আর রোগী ধারণের জায়গা নেই। কারণ দ্বিগুণ রোগী ভর্তি। বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছেন ১১৬ জন। জেলা এ পর্যন্ত ২ হাজার ৫৯২ জন হামে আক্রান্ত হয়। ইতিমধ্যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১০ জন। বাকি তিন জনের হাম শনাক্ত হয়।
একেক শয্যায় দুই রোগী
বিবার (৭ জুন) বিকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের ৫০ শয্যা হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে ৮০ শিশু। একটি শয্যায় দুজন করে চিকিৎসা নিচ্ছে। তীব্র গরমে অসুস্থ শিশুদের নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন স্বজনরা। অপরদিকে শয্যার তুলনায় রোগী প্রায় দ্বিগুণ থাকায় চিকিৎসক ও নার্সদের হিমশিম খেতে হয়।
একই অবস্থা হাসপাতালের দোতলায় অবস্থিত ৯ নম্বর ওয়ার্ডে। এখানেও হাম সন্দেহে আসা ৩৬ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদের অবস্থা নিচতলায় চিকিৎসা নেওয়া শিশুদের চেয়ে কিছুটা জটিল। অধিকাংশের মুখে অক্সিজেন, সঙ্গে চলছে স্যালাইন।
এখানে দায়িত্বরত দুজন নার্স জানিয়েছেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের অবস্থা কিছুটা ভালো হলে তাদের নিচে অবস্থিত হাম ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার পর তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
রোগীদের অবস্থা
হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে অন্যান্য শয্যার মতো ১২ নম্বর শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছে দুই শিশু। তারা হলো- সাড়ে চার বছরের তাসফিয়া আকতার ও সাড়ে তিন বছরের আবির। তাসফিয়ার বাবা মো. রুমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি নগরের বাস সিগন্যাল এলাকা থেকে এসেছি। হঠাৎ দেখি আমার মেয়ের শরীরে লাল রেশ। তার জ্বর এবং কাশি ছিল। মেয়ের অবস্থা দেখে হাসপাতালে নিয়ে আসি। জরুরি বিভাগ থেকে প্রথমে চিকিৎসক ভর্তি দেন দোতলায়। পরে কিছুটা সুস্থ হলে হাম ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। তার অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা ভালো। তবে এখানে এক বেডে দুজন করে শিশু ভর্তি আছে। নড়াচড়াও করা যাচ্ছে না।’
বিভিন্ন জেলা থেকে রোগী আসছে
কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও বিভাগের প্রায় সব জেলা অর্থাৎ কুমিল্লা, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ফেনী থেকেও হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী আসছে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তবে হাম শনাক্তে পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় বিপাকে পড়েছেন রোগীদের স্বজনরা।
প্রাপ্তবয়স্করাও হামে আক্রান্ত
শুধুমাত্র শিশুরাই যে হামে আক্রান্ত হচ্ছে তা নয়। উপসর্গ নিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক ছয় জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এই ছয় জনের বয়স ১৪ থেকে ২৪ বছর। শুধু তাই নয়, আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে হাসপাতালের ২৫ বছর বয়সী এক ইন্টার্ন চিকিৎসকও হামে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ১১৬ রোগী
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে ১১৬ জন হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছে। নিচতলায় অবস্থিত হাম ওয়ার্ড এবং দোতলায় অবস্থিত ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে তাদের চিকিৎসা চলছে। রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় কোনও কোনও শয্যায় একসঙ্গে দুজন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হামে যে শুধু শিশুরাই আক্রান্ত হচ্ছে তা নয়, প্রাপ্তবয়স্ক ছয় জন রোগী উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসা দিতে গিয়ে একজন ইন্টার্ন চিকিৎসকও হামে আক্রান্ত হয়েছেন।’
চট্টগ্রামে হামের হটস্পট নয়টি ওয়ার্ড
চট্টগ্রাম নগরের নয়টি এলাকাকে হামের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নগরের যেসব এলাকায় হামের রোগী বেশি শনাক্ত হয়েছে সেদিক বিবেচনা করে ওই নয়টি এলাকাকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সম্প্রতি হটস্পট নির্ধারণের কথা জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার সার্ভিল্যান্স অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন মেডিক্যাল অফিসার (এসআইএমও) খাদিজা আহমেদ।
খাদিজা আহমেদ বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে এখন বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি চলছে। শুধু চট্টগ্রামে নয়, সবখানে পজিটিভ কেস আছে। হাম ছড়িয়ে পড়েছে।’
নগরে চিহ্নিত হামের হটস্পটগুলো হলো- নগরীর ২ নম্বর জালালাবাদ, ৪ নম্বর চান্দগাঁও, ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী, ১৪ নম্বর লালখান বাজার, ১৮ নম্বর পূর্ব বাকলিয়া, ৩১ নম্বর আলকরণ, ৩৮ নম্বর দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ও ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ড।
চট্টগ্রামে ২ হাজার ৩১৩ জন হামে আক্রান্ত
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, জেলায় এ পর্যন্ত ২ হাজার ৩১৩ জন হামে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে মহানগরে ২ হাজার ২১৫ জন এবং জেলায় ৯৮ জন। শনিবার ৭১ জন উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর মধ্যে দুজন উপজেলায় এবং ৬৯ জন নগরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়। এ পর্যন্ত হাম সংক্রমণে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে। বাকি তিন জনের মৃত্যু হয়েছে হামে।
হাম পরীক্ষার ল্যাব থাকলেও নেই কিট
চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে রোগী ভর্তি বাড়লেও শনাক্তে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নেই পরীক্ষার ব্যবস্থা। ফলে উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল) ল্যাবে। অথচ হাম রোগ শনাক্তের মতো ল্যাব রয়েছে ফৌজদারহাটে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল ইনফেকশাস ডিজিজেসে (বিআইটিআইডি)।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৪৫ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকার ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে নগরের ১ হাজার ১৬২ জন এবং জেলার ২৮৩ জন। দুই-তিন দিনের মধ্যে এসব রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম। তবে বিআইটিআইডি হাসপাতালে হাম শনাক্তের ল্যাব থাকলেও কিট সংকট ও অনুমতির অভাবে তা চালু করা যাচ্ছে না। নমুনা ঢাকায় পাঠানো এবং রিপোর্ট আসার মাঝে নষ্ট হচ্ছে সময়।
বিআইটিআইডির অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে বিএসএল-২ প্লাস এবং বিএসএল-৩ অর্থাৎ বায়োসেফটি লেভেল-৩ ল্যাবরেটরি রয়েছে, যা বাংলাদেশে একমাত্র কার্যকর বায়োসেফটি লেভেল-৩ ল্যাবরেটরি। চলমান হাম বা মিজেলস রোগ নির্ণয়ের জন্য আমাদের যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। বিআইটিআইডি হাসপাতালের ল্যাবে হাম পরীক্ষা সম্ভব। তবে হাম-রুবেলা পরীক্ষার জন্য কিট নেই। কিটের জন্য ইতিমধ্যে আমরা ঢাকায় চিঠি লিখেছি। কিট এবং অনুমোদন পেলে পরীক্ষা শুরু করা যাবে।’
তিনি বলেন, ‘৯৯ শতাংশ চিকিৎসকই রোগীর উপসর্গ দেখে হাম শনাক্ত করতে পারেন। হাম একটি পরিচিত এবং পুরাতন রোগ। হামের প্রধান তিনটি লক্ষণের মধ্যে রয়েছে, বেশি মাত্রায় জ্বর, কাশি এবং শরীরে রেশ থাকবে। সাধারণত হাম রোগীদের র্যাশ মুখ এবং কান দিয়ে শুরু হয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। যে কারণে এসব লক্ষণ দেখা গেলে বোঝা যায় শরীরে হাম হয়েছে।’
জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে এখনও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি হচ্ছে। ইতিমধ্যে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে শতভাগ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। আশা করছি কয়েক মাসের মধ্যে হামের সমস্যা আর থাকবে না।’



