প্রোস্টেট ক্যান্সার পুরুষদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্যান্সার। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রোগের ঝুঁকি বাড়ে। অনেক সময় রোগটি ধীরে ধীরে এগোয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে হাড়, লিম্ফ নোড বা শরীরের অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রোস্টেট ক্যান্সার ব্যবস্থাপনায় এখন একটি নতুন ধারণা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সেটি হলো থেরানোস্টিকস।
থেরানোস্টিকস কী?
থেরানোস্টিকস শব্দটি এসেছে দুটি শব্দ থেকে—থেরাপি অর্থাৎ চিকিৎসা এবং ডায়াগনস্টিকস অর্থাৎ রোগ নির্ণয়। সহজ ভাষায় বললে, একই লক্ষ্যবস্তুকে ব্যবহার করে প্রথমে ক্যান্সার কোথায় আছে তা খুঁজে বের করা হয়, এরপর সেই লক্ষ্যবস্তুকেই ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া হয়। তাই এটি একই সঙ্গে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার একটি সমন্বিত পদ্ধতি।
PSMA-ভিত্তিক পদ্ধতি
প্রোস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো PSMA, যার পূর্ণরূপ Prostate-Specific Membrane Antigen। প্রোস্টেট ক্যান্সারের অনেক কোষের গায়ে এই বিশেষ প্রোটিন থাকে। প্রথমে PSMA PET-CT scan করে দেখা হয় শরীরে ক্যান্সার কোথায় কোথায় আছে। অনেক সময় সাধারণ CT scan, MRI বা bone scan-এ ছোট ছোট ছড়ানো রোগ বোঝা কঠিন হয়। PSMA PET-CT চিকিৎসকদের রোগের বিস্তার সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা দেয়। ফলে রোগীর জন্য সঠিক চিকিৎসা পরিকল্পনা করা সহজ হয়।
Lutetium-177 PSMA থেরাপি
যদি দেখা যায় রোগীর ক্যান্সার কোষগুলো PSMA-positive, তখন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে Lutetium-177 PSMA therapy দেওয়া যেতে পারে। এই চিকিৎসায় একটি বিশেষ ওষুধ PSMA-কে লক্ষ্য করে ক্যান্সার কোষের কাছে পৌঁছে যায়। সেই ওষুধের সঙ্গে যুক্ত থাকে সামান্য পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ Lutetium-177। এটি ক্যান্সার কোষের কাছাকাছি গিয়ে বিকিরণ দেয় এবং ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে সাহায্য করে। এর বড় সুবিধা হলো, চিকিৎসাটি তুলনামূলকভাবে লক্ষ্যভিত্তিক। অর্থাৎ, যতটা সম্ভব ক্যান্সার কোষে আঘাত করে এবং শরীরের স্বাভাবিক কোষে অযথা ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করা হয়।
কারা এই চিকিৎসার উপযুক্ত?
তবে থেরানোস্টিকস সব প্রোস্টেট ক্যান্সার রোগীর জন্য নয়। সাধারণত যেসব রোগীর প্রোস্টেট ক্যান্সার শরীরের অন্য জায়গায় ছড়িয়ে গেছে এবং হরমোন থেরাপি, কেমোথেরাপি বা অন্যান্য চিকিৎসার পরও রোগ বাড়ছে, তাদের মধ্যে নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করলে এই চিকিৎসা বিবেচনা করা হয়। চিকিৎসা শুরু করার আগে রোগীর PSMA PET-CT রিপোর্ট, কিডনির কার্যকারিতা, রক্তের অবস্থা, অস্থিমজ্জার সক্ষমতা এবং সার্বিক শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করা জরুরি।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা
এই চিকিৎসার কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও থাকতে পারে। যেমন মুখ শুকিয়ে যাওয়া, দুর্বলতা, বমিভাব, রক্তের কোষ কমে যাওয়া বা কিডনির ওপর প্রভাব পড়া। তাই এটি অবশ্যই অভিজ্ঞ নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, মেডিকেল বা ক্লিনিক্যাল অনকোলজিস্ট, ইউরোলজিস্ট, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট এবং প্রশিক্ষিত টিমের সমন্বয়ে করা উচিত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের বাস্তবতায় থেরানোস্টিকস একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। আমাদের দেশে অনেক রোগী দেরিতে চিকিৎসকের কাছে আসেন। ফলে রোগ ধরা পড়ার সময় অনেকের ক্যান্সার ইতোমধ্যে ছড়িয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে PSMA PET-CT এবং Lutetium-177 PSMA therapy প্রোস্টেট ক্যান্সার ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই চিকিৎসা এগিয়ে নিতে প্রয়োজন আধুনিক অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল, নিরাপদ রেডিয়েশন ব্যবস্থাপনা, সঠিক রোগী নির্বাচন এবং চিকিৎসার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনার উদ্যোগ।
শেষ কথা হলো, থেরানোস্টিকস কোনো ম্যাজিক চিকিৎসা নয়। এটি প্রোস্টেট ক্যান্সার চিকিৎসার একটি আধুনিক ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সার্জারি, হরমোন থেরাপি, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি ও supportive care-এর সঙ্গে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করলে এটি অনেক রোগীর জন্য নতুন আশার দরজা খুলে দিতে পারে।
লেখক: ডা. আরমান রেজা চৌধুরী, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, এভারকেয়ার হাসপাতাল ঢাকা



