বরেণ্য চিত্রশিল্পী আতিয়া ইসলাম আর নেই
বরেণ্য চিত্রশিল্পী আতিয়া ইসলাম মারা গেছেন

বরেণ্য চিত্রশিল্পী আতিয়া ইসলাম (১৯৬২-২০২৬) আজ বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি দীর্ঘদিন ক্যানসারে ভুগছিলেন।

শিল্পী আতিয়া ইসলামের কর্মজীবন ও পরিচিতি

আতিয়া ইসলাম ক্যানভাসে রঙে ও রেখায় সমাজে নারীর অবস্থান চিত্রিত করেছেন। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, পুরুষ আধিপত্যবাদের মধ্যে নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা তিনি ক্যানভাসে যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি তাঁর চিত্রকর্মে প্রকাশ পেয়েছে নারীবাদী আন্দোলন ও প্রতিবাদের গল্প। চিত্রকর্মে নারীর এমন দাপুটে প্রকাশ তাঁকে নারীবাদী শিল্পী হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।

আতিয়া ইসলাম মূলত বাস্তব ধারায় ছবি এঁকেছেন। তাঁর কাজ ছিল বক্তব্যপ্রধান। নারীর ওপর অন্যায়ের প্রতিবাদের পাশাপাশি সমাজের সব অসংগতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন রঙে-রেখায় প্রতিবাদে সোচ্চার। সামাজিক বৈষম্য, সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক-সামাজিক সংকটকে তাঁর ছবির প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিল্পশৈলী ও স্বীকৃতি

আতিয়া ইসলাম চিত্রকলায় প্রধানত উজ্জ্বল রং ব্যবহার করতেন। তাঁর শিল্পভাষা ছিল রূপকধর্মী, ব্যঙ্গাত্মক ও প্রতীকনির্ভর। বক্তব্য ও উপস্থাপনা ছিল বেশ জোরালো ও তীব্র ব্যঞ্জনাময়। নব্বইয়ের দশকে দেশের নারী শিল্পীদের মধ্যে তিনি তাঁর কাজের স্বাতন্ত্র্য, বক্তব্যের স্পষ্টতা ও উপস্থাপনার ভিন্নতা দিয়ে বিদগ্ধজনদের কাছে প্রশংসিত হয়েছেন। নারী শিল্পীদের মধ্যে স্বতন্ত্র অবস্থান করে নিয়েছিলেন।

শিক্ষা ও ব্যক্তিগত জীবন

আতিয়া ইসলামের জন্ম ১৯৬২ সালে ঢাকায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ১৯৮২ সালে অঙ্কন ও চিত্রায়ণ (ড্রয়িং ও পেইন্টিং) বিভাগ থেকে বিএফএ এবং ১৯৮৫ সালে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮১-৮২ সময়ে চারুকলায় ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন আতিয়া ইসলাম।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিল্পী আতিয়া ইসলামের বাবার নাম আজিজুল ইসলাম ভুইয়া ও মায়ের নাম আয়শা ইসলাম। তাঁরা কেউ বেঁচে নেই। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন তিনি। শিল্পী হাসান মাহমুদ তাঁর স্বামী। তাঁদের দুই মেয়ে রয়েছে। আতিয়া ইসলাম আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্রান্সপ্রবাসী চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের শ্যালিকা।

শিক্ষকতা ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড

আতিয়া ইসলাম ইংরেজি মাধ্যম স্কুল সানবিমসের চিত্রাঙ্কন বিষয়ের শিক্ষক ছিলেন। তিনি ধানমন্ডিতে ‘ঝাপি স্কুল অব আর্ট’ নামে শিশুদের চিত্রাঙ্কন শেখানোর স্কুল পরিচালনা করতেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ব্রিটিশ কাউন্সিলসহ বিভিন্ন সংস্থা আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন। প্রথম আলোর ঈদসংখ্যায় অলংকরণের কাজ করেছেন ও প্রথম আলো আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

প্রদর্শনী ও পুরস্কার

গ্যালারি ২১ ও বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টস, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে একক চিত্র প্রদর্শনী ছাড়াও ১৯৮১ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, মিয়ানমার ও বাংলাদেশে ৬০টির বেশি দলীয় প্রদর্শনীতে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে।

আতিয়া ইসলামের প্রথম একক শিল্পপ্রদর্শনীর বিষয় ছিল নারী ও সমাজ, তাঁর দ্বিতীয় একক প্রদর্শনীতে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট এবং তৃতীয় একক প্রদর্শনীতে জীবনযাপন, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে উপজীব্য করে আঁকা চিত্রকর্ম স্থান পায়।

আতিয়া ইসলাম ১৯৭৬ সালে জুনিয়র রেডক্রস জাতীয় চিত্র প্রদর্শনীতে প্রথমবার পুরস্কার পেয়েছিলেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত ১৮তম এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল বাংলাদেশ (২০১৮)-এ প্রধান পুরস্কার লাভ করেন তিনি।

শেষকৃত্য

আতিয়া ইসলামকে আজই রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে তাঁর স্বামী হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন।