নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, এমনকি পাকিস্তানও যদি শিক্ষায় জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ৫ শতাংশ বরাদ্দ দিতে পারে তাহলে বাংলাদেশ কী কারণে এটা পারবে না—এ প্রশ্ন তুলেছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। ‘সরকারের অগ্রাধিকার ও শিক্ষা খাত: বাজেট ও বাস্তবতা’ শীর্ষক সংলাপে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক এই অধ্যাপক বলেন, শিক্ষায় বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও নিচের দিকে রয়েছে। বহু বছর ধরেই দেশের নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের দাবি করা হলেও তা হয়নি। শিক্ষা-স্বাস্থ্য নিয়ে কথা উঠলেই বলা হয়, ‘টাকা নেই’।
সংলাপের আয়োজন
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এই সংলাপের আয়োজন করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ। সংলাপে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারের উদ্দেশে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এটা পারতে হবে, এটা অগ্রাধিকার হিসেবে থাকতে হবে। হয়তো একবারেই এটা হবে না, বছর-বছর একটা পরিকল্পনা করে করা যেতে পারে।’
কোচিং সেন্টার ও শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন
সংলাপে কোচিং সেন্টার সম্পর্কে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ে পড়তে যাচ্ছে, কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস হচ্ছে না; আর শিক্ষকেরা পড়াতে যাচ্ছেন, কারণ তাঁদের বাড়তি আয় দরকার। এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঠিক করার জন্য দুই দিক থেকেই কাজ করতে হবে। শিক্ষকদেরও যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের একটি সিদ্ধান্তে শিক্ষায় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, শুধু এই সিদ্ধান্তটা যদি সরকার থেকে আসে যে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য (এমপি), সরকারি কর্মকর্তা—যাঁরা জনপ্রতিনিধি, তাঁদের সন্তান ও স্বজনদের পাবলিক শিক্ষার মধ্যে যুক্ত করা হবে, তাহলেই হবে। এই সিদ্ধান্তের জন্য কোনো পয়সা লাগবে না। এর জন্য কোনো বাজেট, বিদেশি ঋণ কিছুই লাগবে না। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন হবে। এর ফলে এমপি, প্রশাসন ক্যাডার বা পুলিশ ক্যাডার হওয়ার চাপটাও কমে যাবে।
জরিপ ও শিক্ষা কমিশনের প্রস্তাব
এমপিসহ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের কতজনের সন্তান দেশের মূলধারার বিদ্যালয়ে পড়ছে বা দেশে আছে কি না, এ ব্যাপারে একটি জরিপ হতে পারে বলে সংলাপে উল্লেখ করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী। বেসরকারি খাতে পরিচালিত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একটি ‘রেগুলেটরি মেকানিজমে’ (নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন ব্যবস্থাপনা) আনারও দাবি জানান রাশেদা কে চৌধূরী। এ ছাড়া একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি। শিক্ষার্থীদের ‘মিড ডে মিলের’ (স্কুলে সরকারিভাবে দেওয়া দুপুরের খাবার) ক্ষেত্রে ভারতের তামিলনাড়ুর অভিজ্ঞতা অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়ে রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘আমি নিজের চোখে দেখে এসেছি, তামিলনাড়ুতে মিড ডে মিলের বিষয়টিতে শিক্ষকদের জড়িত করা হয় না। তাঁরা থাকবেন শ্রেণিকক্ষে। শিক্ষার্থীদের মা-বাবা বা অভিভাবকেরা এই কাজে যুক্ত থাকেন। কোনো মা তাঁদের সন্তানদের খারাপ খাবার দেবেন না।’
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারায় নিম্ন আয় থেকে উচ্চ আয়ে যাওয়ার সুযোগ অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। এ ছাড়া তিনি বলেন, শিক্ষায় বাজেট বাড়াতে গেলে ‘রিস্ট্রাকচারিংটা’ (কোন জায়গায় কমিয়ে কোন জায়গায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে) কীভাবে হবে, সেই আলোচনাও প্রয়োজন। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা মিড ডে মিলসহ সরকারি প্রণোদনা পাচ্ছে না বলে জানান মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মিঞা মো. নূরুল হক।
রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের বক্তব্য
সংলাপে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চারজন এমপি অংশ নেন। এ ছাড়া একজন স্বতন্ত্র এমপিও ছিলেন। পাঁচ এমপির মধ্যে চারজনই নারী। স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানা বলেন, ‘দলীয়করণ এখন স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পর্যন্ত। রাষ্ট্রে যখন পচন শুরু হয় সেটা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, নিরাপত্তা, অর্থনীতি সব জায়গাকেই প্রভাবিত করে। রাজনীতি ঠিক না হলে কিচ্ছু ঠিক হবে না।’ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যাপারে ‘নো কম্প্রোমাইজে’ (আপস নয়) যাওয়ার সময় এসেছে উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমি সরাইলের এমপি, আমার সন্তানকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা স্কুলে পড়তে হবে। দ্বিতীয়ত, এমপিকে নিজের এলাকায় চিকিৎসা নিতে হবে। ইতিমধ্যে আমি এটা শুরু করেছি। আমি এলাকার হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। আমার বড় কোনো অসুখ নেই। হলে জেলা হাসপাতালে যাব। এগুলো যদি বাধ্যতামূলক করা হয়, তাহলে শত শত কোটি টাকার ঋণখেলাপি যাঁরা এমপি হওয়ার দৌড়ে আছেন, তাঁদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।’
এমপিদের ছেলেমেয়েরা কোথায় পড়ে, তা নিয়ে জরিপ হতে পারে বলে মনে করেন জামায়াতে ইসলামীর এমপি শফিকুল ইসলাম (মাসুদ)। তিনি বলেন, দেশে নানা ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত আছে। স্কুল আছে, মাদ্রাসা আছে, ইংরেজি মাধ্যম আছে, কওমি আছে। এভাবে ১৩টা ধারায় একটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা থাকবে আর জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার প্রত্যাশা করা হবে—এটা তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। ১৩ ধারা থেকে শিক্ষাব্যবস্থাকে একেবারে ওয়ান ওয়ে, ওয়ান সিস্টেম, ওয়ান ডেভেলপমেন্ট—এই পলিসি যখন করা যাবে, তখনই এই তামাশা থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে।
শিক্ষার বিষয়টি নিয়ে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে নাগরিক সমাজের প্রতি আহ্বান জানান সংরক্ষিত আসনে বিএনপির এমপি নিলোফার চৌধুরী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সমস্যা তৈরি হবে বলে সংলাপে উল্লেখ করেন সংরক্ষিত আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর এমপি মারদিয়া মমতাজ। সংরক্ষিত আসনের আরেক এমপি ও এনসিপি নেত্রী মাহমুদা আলম (মিতু) বলেন, শিক্ষায় দুর্নীতি কমানো নিয়ে ‘পলিসি ডিসকাশন’ হওয়া উচিত।
জাতীয় দাবি ও শিক্ষা আন্দোলন
সংলাপের সঞ্চালক ছিলেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি আলোচকদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নও করেন। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব মানসম্পন্ন শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এটি না হলে আগামী দিনে বাংলাদেশের সম্ভাবনা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। মানসম্পন্ন শিক্ষার দাবিকে জাতীয় দাবি হিসেবে সামনে নিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশে নতুন করে আরেকটি শিক্ষা আন্দোলনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
সরকারের প্রতিশ্রুতি
সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে এমপিদের থাকার সুযোগ নেই। তবে এসব জায়গায় রাজনীতিবিদেরা (মন্ত্রী ও এমপি নন) থাকতে পারবেন না বলে যে দাবি উঠেছে, এর সঙ্গে একমত নন তিনি। ইবতেদায়ি ও কওমি শিক্ষাকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। এ ছাড়া তিনি বলেন, শিক্ষায় বাজেট বাড়ানো এবং সেটা যাতে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়, সে বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সংলাপে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী, অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ ফারুক–উজ–জামান, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী, ইয়ুথ পলিসি ফোরামের নির্বাহী পরিচালক আমের মোস্তাক আহমেদ, ইউনেসকো বাংলাদেশের হেড অব এডুকেশন নোরিহিদে ফুরুকাওয়া, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা কাজল দেবনাথ প্রমুখ বক্তব্য দেন।



