জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের অধ্যাপক কিয়োকো নিওয়া বাংলা সাহিত্যের একজন নিবেদিত অনুবাদক ও গবেষক। তিনি প্রথম আলোর সাক্ষাৎকারে তাঁর জন্ম, শৈশব, শিক্ষাজীবন ও বাংলা সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের কথা বিস্তারিত বলেছেন।
শৈশব ও শিক্ষা
কিয়োকো নিওয়ার জন্ম ও বর্তমান বাসস্থান জাপানের সাইতামা শহরে, যা টোকিওর পাশে অবস্থিত। ছোটবেলা থেকেই তিনি বই পড়তে ভালোবাসতেন। কোনো ভাইবোন না থাকায় এবং বাইরে খেলাধুলা পছন্দ না করায় ছুটির দিনে বাড়িতে বই পড়েই সময় কাটাতেন।
জাপানে মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ইংরেজি শেখা বাধ্যতামূলক ছিল, তবে অন্য বিদেশি ভাষার সুযোগ ছিল না। হাইস্কুলে পড়ার সময় তিনি এক বছরের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশ নেন, যা তাঁর ইংরেজি দক্ষতা বাড়ায়। তিনি বিদেশি সাহিত্য জাপানি সাহিত্যের চেয়ে বেশি পছন্দ করতেন এবং অজানা পৃথিবীর প্রতি কৌতূহল ছিল বেশি।
ভারতে পিএইচডি ও বাংলা ভাষা শেখা
নিওয়া ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। কলকাতা ও জাপানের জীবনযাত্রার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকায় আবহাওয়া, খাবার ও অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাঁর প্রায় এক বছর লেগেছিল। দ্বিতীয় বছর থেকে সবকিছু সহজ হয়ে যায়। শুরুতে বাংলা ভাষা না জানায় কষ্ট হলেও ধীরে ধীরে তা রপ্ত করেন। তিনি জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দি ভাষা নিয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু হিন্দি বলা তাঁর জন্য কঠিন ছিল; বাংলা বলাই বেশি সহজ মনে হতো।
বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই তিনি বিদেশি সাহিত্য নিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ইংরেজি বা ফরাসির মতো জনপ্রিয় ভাষা নয়, বরং জাপানে অপরিচিত ভাষা শিখতে চেয়েছিলেন। তিনি ভারতকে বেছে নেন, কারণ ভারতের দীর্ঘ ইতিহাস আছে এবং নতুন কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। শুরুতে হিন্দি সাহিত্য নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করেন এবং ছায়াবাদী কবিদের ওপর গবেষণাপত্র লেখেন। সে সময় জানতে পারেন যে ছায়াবাদী কবিরা রবীন্দ্রনাথের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, তাই তিনি রবীন্দ্রনাথকে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমবার নিজে চেষ্টা করে মূল বাংলায় ‘গীতাঞ্জলি’ পড়েছিলেন; অধিকাংশ বিদেশি ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে চেনেন, কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে উল্টোটা হয়েছিল।
অনুবাদ যাত্রা ও প্রকাশিত গ্রন্থ
১৯৯৩ সালে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের মাধ্যমে তাঁর অনুবাদযাত্রা শুরু। এ পর্যন্ত তিনি মোট আটটি অনূদিত বই প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে নজরুল ইসলামের কবিতা সংগ্রহ, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের কবিদের কবিতার সংকলন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘জাপানযাত্রী’ উল্লেখযোগ্য।
জাপানি পাঠকদের মধ্যে ‘লালসালু’ সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে, কারণ জাপানি পাঠকেরা কবিতার চেয়ে গল্প-উপন্যাস পছন্দ করেন এবং রাজনীতি ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে লেখা কঠোর দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন সাহিত্য বেশি পছন্দ করেন।
জাপানে বাংলা ভাষার প্রসার
নিওয়া টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজে বাংলা বিভাগ খোলার প্রথম শিক্ষক। তাঁর আগে পেশাদারভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শেখানোর কোনো জায়গা ছিল না। শিক্ষার্থীরা ভাষা ও সাহিত্যের চেয়ে সামাজিক কর্মকাণ্ডে বেশি আগ্রহী, তবে বাংলা ভাষা জানার ফলে তাঁরা জাইকা, এনজিও বা বাংলাদেশে কাজ করা কোম্পানিতে যোগ দেন।
গত কয়েক দশকে জাপানে বিদেশি ভাষার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। নিওয়ার ছোটবেলায় বিদেশ বলতে শুধু ইউরোপ-আমেরিকা বোঝাত, কিন্তু এখন লোকেরা বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন এবং সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বর্তমানের হিন্দি বা বাংলা ভাষার শিক্ষার্থীদের চাকরির বাজারে তেমন সমস্যা নেই। ইউটিউব ও অন্যান্য মিডিয়ার কল্যাণে ঘরে বসেই যেকোনো দেশের বাস্তব চিত্র দেখা যায়।
বর্তমান কাজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সম্প্রতি নিওয়া রবীন্দ্রনাথের কবিতার একটি সংকলনের অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজ শেষ করেছেন। বইটি এ মাসেই প্রকাশিত হবে। কবির যৌবন থেকে শেষ জীবন পর্যন্ত লেখা বিভিন্ন কবিতা থেকে বাছাই করে মোট ৭৭টি কবিতা অনুবাদ করেছেন। তিনি চেয়েছেন, জাপানি পাঠকেরা যেন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের বিস্তৃত দিক সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপরের কাজ হিসেবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ অনুবাদের পরিকল্পনা রয়েছে, যা তিনি শুরু করেছেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি বার্তা
নিওয়া মনে করেন, বাংলা সাহিত্যে অনেক কিছু অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। তিনি যা অনুবাদ করেছেন তা সমুদ্রের একটি বিন্দুর সমান এবং একা এই বিপুল সাহিত্যভান্ডার শেষ করা অসম্ভব। ইন্টারনেট ও এআইয়ের কল্যাণে অনুবাদ সহজ হয়েছে, তবে সাহিত্যের চূড়ান্ত কাজ মানুষের সংবেদনশীলতা দিয়েই সম্পন্ন করতে হয়। তিনি আশা করেন, কেবল বাংলা সাহিত্য নয়, বিদেশি সাহিত্যের যেকোনো শাখায় আরও বেশি মানুষ আগ্রহী হয়ে উঠবেন।



