শহরে শিক্ষা ব্যবস্থার জটিলতা ও অভিভাবকদের মনস্তত্ত্ব পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা
শহরে শিক্ষা ব্যবস্থার জটিলতা ও অভিভাবক মনস্তত্ত্ব

সৌমিত জয়দ্বীপের লেখা এই প্রবন্ধে শিক্ষাব্যবস্থার নানা জটিলতা তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও শহরাঞ্চলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আধিক্য এবং স্তরান্তরজনিত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রথম বা তৃতীয় শ্রেণি থেকেই ভর্তি পরীক্ষা বা লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করতে হয়, যা অভিভাবকদের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করে। এসব প্রতিষ্ঠানে একবার ভর্তি হলে দশম বা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়া যায়, ফলে ভর্তি-চাপ আরও বাড়ে।

শহরাঞ্চলে শিক্ষা সংকট

ঢাকার উদাহরণ দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন যে, মাধ্যমিক স্তরের প্রতিষ্ঠানের ৯২.৫ শতাংশই বেসরকারি। ঢাকা জেলায় এই হার ৮৬ শতাংশ। অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরে ১৪টি বড় শহরের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হার ৫২.৫ শতাংশ, কিন্তু ঢাকা জেলায় তা ৮২ শতাংশ। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহে সরকারি-বেসরকারি অনুপাত ৪৮-৫২ শতাংশের মধ্যে থাকলেও নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে তা যথাক্রমে ৬৭ ও ৭৪ শতাংশ।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত

দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত কমছে। ২০১১ সালে ৫৩ জন শিক্ষার্থী প্রতি শিক্ষক থাকলেও ২০২৪ সালে তা ২৮ জনে নেমেছে। কিন্তু ঢাকায় এই অনুপাত অনেক বেশি। মিরপুরে ৭২, লালবাগে ৫২, ক্যান্টনমেন্টে ৫১, রমনায় ৫৪, মতিঝিলে ৪৮, ধানমন্ডিতে ৪০ ও মোহাম্মদপুরে ৩৯ জন শিক্ষার্থী প্রতি শিক্ষক। কেবল নওয়াবগঞ্জ (২৫), গুলশান (৩০), সূত্রাপুর (৩১) ও তেজগাঁও (৩১) জাতীয় মানের কাছাকাছি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অভিভাবকদের মনস্তত্ত্ব

অভিভাবকদের মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি অনীহা দেখা যায়। তারা সন্তানকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে কোচিং-এর ওপর নির্ভরশীল করে তোলেন। লেখকের মতে, শিক্ষাব্যবস্থার খোলনলচে বদলাতে অভিভাবকদের মনস্তত্ত্বের পরিবর্তন জরুরি।

বয়স লুকানোর প্রবণতা

অভিভাবকেরা সন্তানের বয়স লুকিয়ে মাদ্রাসা বা সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করান, যা নৈতিকতার পরিপন্থী। জন্মনিবন্ধন থাকা সত্ত্বেও এই দুর্নীতি চলছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সমাধান প্রস্তাব

  • পিএসসি পরীক্ষা চালু: পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার পরিবর্তে পিএসসি পরীক্ষা পুনরায় চালু করে সব শিক্ষার্থীকে এই ফলাফলের ভিত্তিতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করা।
  • স্তরান্তর নীতি: প্রথম, ষষ্ঠ ও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি-জানালা উন্মুক্ত করতে হবে এবং নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কোটার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
  • শিক্ষানিবন্ধন: প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির সময় অনলাইন জন্মনিবন্ধনের পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষানিবন্ধন সার্ভারে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • ক্যাচমেন্ট এরিয়া: ওয়ার্ড বা ইউনিয়নভিত্তিক ক্যাচমেন্ট এরিয়া নির্ধারণ করে শিক্ষার্থীদের নিকটস্থ প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
  • দ্বৈত পালা: সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বৈত পালা চালু করে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা সমবণ্টন করতে হবে।
  • শিক্ষা জাতীয়করণ: প্রাথমিক শিক্ষাকে শতভাগ জাতীয়করণের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
  • কোচিং বন্ধ: সব কোচিং সেন্টার বন্ধ করতে হবে এবং শিক্ষকদের কোচিং ব্যবসায় জড়িত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • শিক্ষা কমিশন: পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন বা টাস্কফোর্স গঠন জরুরি।

লেখকের মতে, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ও মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ করতে হবে। বর্তমানে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ১.৫ শতাংশ ও মোট বাজেটের ১০-১২ শতাংশ।