ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) প্রথমবারের মতো পরিচালিত সমন্বিত বৃক্ষ শুমারি-২০২৫-এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। শুমারিতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ৬২টি গোত্রের ২৭৭টি প্রজাতির মোট ১৭ হাজার ১৬১টি বৃক্ষ শনাক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বৃক্ষসম্পদের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য, কার্বন মজুদ, পরিবেশগত অবদান, স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও অবস্থানভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক তথ্যভাণ্ডারও তৈরি করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসের সবুজায়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বৃক্ষ প্রজাতি ও সংখ্যার বিবরণ
শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বৃক্ষ প্রজাতির মধ্যে ৫৮ শতাংশ দেশি এবং ৪২ শতাংশ বিদেশি। তবে বৃক্ষ সংখ্যার হিসাবে দেশি বৃক্ষ ৫৪ শতাংশ এবং বিদেশি বৃক্ষ ৪৬ শতাংশ। সর্বাধিক সংখ্যক ১৫টি প্রজাতির মধ্যে পাঁচটি বিদেশি প্রজাতি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে মেহগনি, দেবদারু, ম্যাকারথুরি পাম, রেইনট্রি ও সেগুন উল্লেখযোগ্য।
জীবভর ও কার্বন মজুদ
এতে আরও দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বৃক্ষসমূহের মোট ভূ-উপরিভাগীয় জীবভর ৯ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন এবং ভূ-নিম্নীয় জীবভর ২ হাজার ৩৭০ মেট্রিক টন। এসব বৃক্ষের মাধ্যমে মোট ৪ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন কার্বন মজুদ রয়েছে। জীবভরে দেশি বৃক্ষের অবদান ২১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বিদেশি বৃক্ষের অবদান ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
উপযোগিতা ভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ
উপযোগিতার ভিত্তিতে ক্যাম্পাসের বৃক্ষসম্পদের মধ্যে ২৫ শতাংশ ফলদ, ২২ শতাংশ প্রাণিকূল-সহায়ক, ২১ শতাংশ ঔষধি, ২০ শতাংশ কাঠ উৎপাদনকারী এবং ১২ শতাংশ শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ রয়েছে।
বৃক্ষের স্বাস্থ্য মূল্যায়ন
বৃক্ষের স্বাস্থ্য মূল্যায়নে ১ হাজার ৮১১টি বৃক্ষকে বিভিন্ন মাত্রার স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে এবং ২ হাজার ২১৩টি বৃক্ষকে সম্ভাব্য বৃক্ষজনিত বিপর্যয় (ট্রি হ্যাজার্ড) শ্রেণিতে চিহ্নিত করা হয়েছে।
শুমারি পদ্ধতি ও ডাটাবেজ
২০২৫ সালে পরিচালিত এ শুমারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে পাঁচটি প্রধান জরিপ একক ও ৪৫টির বেশি উপ-এককে ভাগ করে প্রতিটি বৃক্ষের তথ্য ডাইরেক্ট মেজারমেন্ট মেথড অনুসরণে সংগ্রহ করা হয়। পরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রজাতিগত বৈচিত্র্য, জীবভর, কার্বন মজুদসহ বিভিন্ন সূচক নিরূপণ করা হয়। পাশাপাশি গুগল মাই ম্যাপস ও আর্কজিআইএস-এর সহায়তায় একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল ও মানচিত্রভিত্তিক বৃক্ষ ডাটাবেজও তৈরি করা হয়েছে।
ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠান
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের কনফারেন্স কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ শুমারির ফলাফল প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরিকালচার সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার এবং আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরিকালচার সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ সংসদ এবং বাংলাদেশ সোসাইটি ফর ইকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
উপাচার্যের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “বৃক্ষ শুমারির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বৃক্ষসম্পদ সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে সবুজায়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।” তিনি দেশীয় ও পরিবেশবান্ধব প্রজাতির বৃক্ষরোপণ সম্প্রসারণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সবুজ, নান্দনিক ও টেকসই ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আরও বলেন, “পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ ও সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এমন একটি ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও দর্শনার্থীরা স্বস্তির সঙ্গে চলাচল করতে পারবেন।” এজন্য পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ সংরক্ষণ, ফলজ ও উপকারী গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরদের বক্তব্য
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, “এ বৃক্ষ শুমারি ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও টেকসই সবুজায়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।” তিনি বায়ুদূষণ সহনশীল দেশীয় বৃক্ষরোপণ, জলাধার সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, “টেকসই ক্যাম্পাস গঠনে বৃক্ষ শুমারি একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ।” তিনি ঝুঁকিপূর্ণ গাছ দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পর্যায়ক্রমে নতুন বৃক্ষরোপণের ওপর জোর দেন।



