জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ইতিহাস বিভাগের নবীন শিক্ষার্থীদের গভীর রাতে ‘ম্যানার’ শেখানোর নামে র্যাগিং দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় ঘটনাস্থলে অভিযান চালিয়ে একই বিভাগের ১২ শিক্ষার্থীকে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শনিবার (৪ জুলাই) ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. আবদুর রাজ্জাক।
ঘটনার বিবরণ
গত শুক্রবার (৩ জুলাই) দিবাগত রাত ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযুক্তরা সবাই ইতিহাস বিভাগের ৫৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তারা হলেন– সুভাশীষ রায়, নাছিম উদ্দিন মজুমদার, আবু আবতাহী অনিক, নাইমুল হাসান, আব্দুল্লাহ মাহদী, ইসফাক হাদী সিক্ত, মো. রায়হান খান, কাজী শাহ জামসেদ আলম নাবিল, সাইফুল্লাহ মানসুর আনান, মো. মাহফুজুর রহমান অন্ত, শ্রী কার্তিক চন্দ্র রায় এবং নাইম আহমেদ সজিব।
কীভাবে ঘটেছে র্যাগিং
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে ইতিহাস বিভাগের ৫৫তম ব্যাচের কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থীদের ফোন করে প্রথমে মহুয়া মঞ্চে যেতে বলে। পরে সেখান থেকে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় ৪০ মিনিট অপেক্ষা করিয়ে মাঠসংলগ্ন একটি নির্জন স্থানে নেওয়া হয়। সেখানে ‘ফরমাল পরিচয়’ ও ‘ম্যানার’ শেখানোর কথা বলে তাদের বিভিন্নভাবে মানসিক ও শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মো. এহসানুল হক বলেন, “আমাদের বাবা-মাকে নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষায় মন্তব্য করা হয়েছে। কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়। ‘ফরমাল পরিচয়’ দেওয়ার কথা বলে দীর্ঘ সময় ধরে মানসিকভাবে অপদস্থ করা হয়, এমনকি শারীরিকভাবেও হেনস্তা করা হয়েছে।” একই ব্যাচের শিক্ষার্থী রাজ খান বলেন, “এটি প্রথমবারের মতো ঘটেনি। এর আগেও একাধিকবার ‘ম্যানার’ শেখানোর অজুহাতে আমাদের গভীর রাত পর্যন্ত সেন্ট্রাল ফিল্ডে বসিয়ে রাখা হয়েছে এবং নানা ধরনের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রশাসনের বক্তব্য
এ ঘটনায় জাকসুর স্বাস্থ্য ও খাদ্যবিষয়ক সম্পাদক এবং অ্যান্টি-র্যাগিং সেলের সদস্য হুসনে মোবারক বলেন, “রাত প্রায় ২টার দিকে এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে খবর পেয়ে আমি এবং জাকসুর কার্যকরী সদস্য মোহাম্মদ আলী চিশতী ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে জানাই। পরে সহকারী প্রক্টর ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এসে অভিযুক্তদের নিরাপত্তা অফিসে নিয়ে যান। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা ঘটনার কথা স্বীকার করেন।” তিনি আরও বলেন, “র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় যখন কঠোর অবস্থানে রয়েছে, তখন এমন ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কোনো শিক্ষার্থীকে ভয়ভীতি দেখানো বা হেনস্তার সুযোগ নেই। এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে জাকসু সবসময় কঠোর অবস্থান বজায় রাখবে।”
প্রশাসনের পদক্ষেপ
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, “ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে যায় এবং অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হয়। পরে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা অফিসে এনে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বিষয়টি প্রক্টরিয়াল বডির সভায় উপস্থাপন করা হবে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”



