সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট নিরসনে পথ খুলে দিয়েছে আপিল বিভাগের সাম্প্রতিক এক রায়। রায়ে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির আইনি বাধা দূর হওয়ায় শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী। তাদের মতে, পদোন্নতি প্রক্রিয়া শুরু হলে শূন্য পদ দ্রুত পূরণ হবে এবং শ্রেণিপাঠদানে গতি ফিরবে।
শিক্ষক সংকটের বর্তমান চিত্র
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের মোট শূন্যপদ আনুমানিক ১৪ হাজার ৩৮৫টি। এসব পদে নিয়োগের জন্য ২০২৬ সাল থেকে নিয়োগ কার্যক্রম চলছে। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ প্রায় ৩৪ হাজার ১৫৯টি। অর্থাৎ দেশের অর্ধেকেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই।
প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ৪৮ হাজারের বেশি শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। তবে সহকারী শিক্ষকের ১৪ হাজার ৩৮৫টি পদে নিয়োগ কার্যক্রম চলমান থাকায় চূড়ান্ত নিয়োগ সম্পন্ন হলে শূন্যপদের সংখ্যা কিছুটা কমে আসবে।
মামলার কারণে আটকে ছিল পদোন্নতি
২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। এরপর পুরোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নতুন জাতীয়করণ করা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্মিলিত জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রণয়ন করা হয় ‘বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিধিমালা, ২০১৩’-এর ৯(১) বিধি অনুযায়ী।
এই বিধি অনুযায়ী নতুন জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের জাতীয়করণের দিন থেকে কার্যকর চাকরিকাল ধরে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি ওই সময়ের অব্যবহিত আগে শিক্ষক পদে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বশেষ ব্যক্তির নিচে তাদের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের দাবি ছিল, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদানের দিন থেকেই তাদের চাকরিকাল গণনা করে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করতে হবে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির (কাসেম-শাহীন) সভাপতি মো. আবুল কাসেম বলেন, এই পরিস্থিতিতে ‘বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিধিমালা, ২০১৩’-এর ৯(১) বিধি চ্যালেঞ্জ করে ২০১৫ সালে সিলেটের গোয়াইনঘাটের শিক্ষক মো. গিয়াসউদ্দিন এবং ২০১৭ সালে নওগাঁ সদর উপজেলার শিক্ষক শাহজামাল সরদার হাইকোর্টে রিট করেন।
তিনি বলেন, এরপরই প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ কার্যত আটকে যায়। কারণ প্রধান শিক্ষকের ৮০ শতাংশ পদ সহকারী শিক্ষক থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে এবং বাকি ২০ শতাংশ পদে সরাসরি নিয়োগের বিধান রয়েছে। মামলার কারণে ৮০ শতাংশ পদে পদোন্নতি বন্ধ হয়ে যায়।
সহকারী শিক্ষকরা বঞ্চিত যে কারণে
‘বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিধিমালা, ২০১৩’-এর ৯(১) বিধির একটি অংশ নিয়ে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া কিছু শিক্ষক আপত্তি জানান। তাদের পক্ষে শিক্ষক শাহজামাল সরদার ২০১৭ সালে হাইকোর্টে রিট করেন।
প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল দেন। পরে ২০১৯ সালের ১১ মার্চ চূড়ান্ত শুনানি শেষে ৯(১) বিধির অংশবিশেষ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেন। এর ফলে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি আটকে যায় এবং দীর্ঘদিন ধরে সহকারী শিক্ষকরা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হন।
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. শামছুদ্দিন মাসুদ বলেন, একাধিক রিটের কারণে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি না হওয়ায় সহকারী শিক্ষকরা দীর্ঘদিন বঞ্চিত হয়েছেন। এখন রিট নিষ্পত্তি হওয়ায় পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই দ্রুত পদোন্নতির ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (শাহিন-লিপি) সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি বলেন, দেশে শিক্ষক সংকট প্রকট। ধাপে ধাপে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও সংকট দূর হয়নি। প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি আটকে থাকায় শ্রেণিপাঠদানেও এর প্রভাব পড়েছে। অতিরিক্ত চাপ নিয়েও শিক্ষকরা পাঠদান চালিয়ে গেছেন, অথচ সহকারী শিক্ষকরা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
তিনি বলেন, এখন আর পদোন্নতিতে কোনও বাধা নেই। তাই দ্রুত পদোন্নতি দিতে হবে। একই সঙ্গে পদোন্নতির ফলে সহকারী শিক্ষকের যেসব পদ শূন্য হবে, সেগুলোতেও দ্রুত নিয়োগ দিতে হবে। তাহলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি শ্রেণিশিক্ষকদের বিভিন্ন সরকারি কাজও করতে হয়। ফলে অনেক সময় শ্রেণিপাঠদানে বিঘ্ন ঘটে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের স্বার্থে সহকারী শিক্ষকরা বাড়তি সময় ব্যয় করেন।
যেভাবে খুললো পথ
‘বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিধিমালা, ২০১৩’-এর ৯(১) বিধির একাংশ নিয়ে দেওয়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ লিভ টু আপিল করে। ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর আপিল বিভাগ লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন এবং হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন।
এরপর ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। পাশাপাশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা আপিল বিভাগে আবেদন করেন। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ আপিল মঞ্জুর করেন। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের দিন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘রায়টি সরকারের পক্ষে, রাষ্ট্রের পক্ষে ঘোষিত হয়েছে। অর্থাৎ হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, সেটি আর থাকলো না।’
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির (কাসেম-শাহীন) সভাপতি মো. আবুল কাসেম বলেন, সব রিট একসঙ্গে নিষ্পত্তি করে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করেছেন। ফলে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি এবং পদোন্নতির কারণে শূন্য হওয়া সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ দিতে আর কোনও বাধা নেই।
শিক্ষকরা জানান, হাইকোর্টের রায় বাতিল হওয়ায় ‘বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিধিমালা, ২০১৩’-এর ৯(১) বিধি বহাল থাকলো। ফলে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির বাধা যেমন দূর হয়েছে, তেমনি পদোন্নতির পর শূন্য হওয়া সহকারী শিক্ষক পদে নতুন নিয়োগের পথও উন্মুক্ত হয়েছে।



