শিশুদের শৈশব নিরাপদ ও রঙিন হোক—এ প্রত্যাশা সবার। সম্প্রতি এক ঘটনায় চার বছরের শিশু রুদ্র ও তার বোন মীনাক্ষী (ছদ্মনাম) নতুন কেনা লাল প্লাস্টিকের গাড়ির চাকা খুলে গেলে তা মুখে দিয়ে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে প্রাণে বাঁচে। এ ধরনের ঘটনা শিশু বিশেষজ্ঞদের কাছে পরিচিত। খেলনার ছোট অংশ গিলে ফেলা, ধারালো প্রান্তে আঘাত, নিম্নমানের রং ও রাসায়নিকের সংস্পর্শ—এসব প্রায়ই দেখা যায়।
সরকারের নতুন মানবিধি
গত ২৭ জুন প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘মানহীন শিশুখেলনা উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রি করা যাবে না’ শিরোনামের প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো শিশু খেলনার জন্য বাধ্যতামূলক বাংলাদেশ মান (বিডিএস) নির্ধারণ করেছে। এখন থেকে নির্ধারিত নিরাপত্তা মান পূরণ ছাড়া কোনো খেলনা উৎপাদন, আমদানি বা বাজারজাত করা যাবে না। শিশু নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
খেলনার ঝুঁকি ও প্রভাব
বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময় শিশু খেলনায় সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতির খবর পাওয়া যায়। এসব উপাদান দীর্ঘমেয়াদে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুতর প্রভাব ফেলে। খেলনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু শিল্পনীতির বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও শিশুর অধিকার রক্ষারও বিষয়।
শৈশবের পরিবর্তন
আশি-নব্বই দশকের শৈশব ছিল মাটি, কাঠ, বাঁশ ও কাপড়ের তৈরি খেলনার জগৎ। কাঠের ঘোড়া, বাঁশের বাঁশি, মাটির পুতুল শুধু খেলনা ছিল না; ছিল পরিবারের ভালোবাসা ও গ্রামের কারিগরের হাতের ছোঁয়া। বর্তমানে প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিক খেলনা সেই জায়গা দখল করেছে, কিন্তু সেখানে নেই সেই গল্প, হাতের উষ্ণতা বা শিকড়ের গন্ধ।
জাপানের উদাহরণ
জাপানের কোবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফেরার সময় লেখকের ছেলে তার খেলনাগুলো সঙ্গে এনেছিল, যা বহু বছর পরও নষ্ট হয়নি। জাপানে বহু বছর ধরে Japan Toy Safety Standard (ST Standard) অনুসরণ করা হয়। খেলনার যান্ত্রিক নিরাপত্তা, রাসায়নিক উপাদান, দাহ্যতা ও বয়সভিত্তিক ব্যবহারযোগ্যতা পরীক্ষা করে ‘ST Mark’ দেওয়া হয়, যা অভিভাবকদের কাছে আস্থার প্রতীক।
সামনের পথ
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার স্বার্থে এখন সময় এসেছে খেলনা-সংক্রান্ত কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। খেলনা কখনো শুধু খেলনা নয়; এটি শিশুর স্বপ্ন, শেখার প্রথম মাধ্যম এবং ভবিষ্যৎ গঠনের নীরব সঙ্গী। প্রয়োজন রাষ্ট্র, উদ্যোক্তা, গবেষক ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, যাতে বাংলাদেশের শিশুরা নিরাপদ খেলনার সঙ্গে বড় হয়ে ওঠে। লেখক: অধ্যাপক, ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।



