দক্ষিণ এশিয়ায় শিক্ষাপ্রযুক্তি: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
দক্ষিণ এশিয়ায় শিক্ষাপ্রযুক্তি: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামে গ্রামে শিক্ষার চিত্র বদলে যাচ্ছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের কল্যাণে যারা আগে শ্রেণিকক্ষের বাইরে ছিল, তারা এখন ভিডিও লেকচার ও অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইতিবাচক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো শিক্ষাপ্রযুক্তি বা এডটেক, যা শিক্ষার দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করার একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

ডিজিটাল সংযোগের বর্তমান চিত্র

দক্ষিণ এশিয়ায় ডিজিটাল সংযোগের হার অসম। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী, ভুটানে ৮৮ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যা এই অঞ্চলে সর্বোচ্চ। মালদ্বীপে এই হার ৮৪-৮৫ শতাংশ। ভারতে প্রায় ৫৭ শতাংশ এবং বাংলাদেশে ৫৩ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় এই হার ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। সবচেয়ে পিছিয়ে আছে আফগানিস্তান, যেখানে মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। পাকিস্তানেও অবস্থা ভালো নয়, সেখানে ২৭-৩৬ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত।

মুঠোফোন ব্যবহারের চিত্র ভিন্ন। নেপালে প্রতি ১০০ জনে ১৩৯টি এবং শ্রীলঙ্কায় ১৪২টি মোবাইল সাবস্ক্রিপশন রয়েছে। বাংলাদেশে এই হার ১১৪ শতাংশ ছাড়িয়েছে। তবে কম্পিউটারের ব্যবহার প্রতিটি দেশেই হতাশাজনকভাবে কম, যা ডিজিটাল শিক্ষার ভীতকে দুর্বল করে রাখছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুঠোফোনই শ্রেণিকক্ষ

দক্ষিণ এশিয়ায় যারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করছে, তাদের ৭০ শতাংশের বেশি মুঠোফোন ব্যবহার করছে। বাংলাদেশেও ইন্টারনেটের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাস ও অ্যাপভিত্তিক পড়াশোনায় যুক্ত হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মহামারির ধাক্কায় বদলে যাওয়া দৃশ্যপট

২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে স্কুল বন্ধ হলে প্রায় ১৭০ কোটির বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সংকট এডটেক প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার প্রায় ১৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। মানুষ বুঝতে পারে, অনলাইন শিক্ষা মানের সঙ্গে আপস নয়, বরং শিক্ষার কার্যকর মাধ্যম। এরপর হাইব্রিড পদ্ধতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

পথ দেখানো প্রতিষ্ঠান

বাংলাদেশে জাগো ফাউন্ডেশন লাইভ ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছে। ব্র্যাক মোবাইল অ্যাপ ও ব্লেন্ডেড লার্নিং মডেলে কাজ করছে। আগামী এডুকেশন ফাউন্ডেশন শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল শিক্ষা মডেলে সক্রিয়। ভারতে ই-বিদ্যালোকা স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষকদের মাধ্যমে ডিজিটাল ক্লাসরুম পরিচালনা করছে। পাকিস্তানে তালিমাবাদ মোবাইল অ্যানিমেশন কনটেন্ট ও অফলাইন পদ্ধতিতে স্কুলছুট শিশুদের শিক্ষামুখী করছে। নেপালে ওপেন লার্নিং এক্সচেঞ্জ অফলাইন ডিজিটাল লাইব্রেরি তৈরি করেছে। শ্রীলঙ্কায় সর্বোদয় ফিউশন ও লকারুনা ফাউন্ডেশন আইসিটি ল্যাব ও কমিউনিটি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ভুটানে সরকারই ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। আফগানিস্তানে কোড টু ইন্সপায়ার ও আফগান ইনস্টিটিউট অব লার্নিং নারী ও কিশোরীদের কোডিং ও ডিজিটাল শিক্ষায় যুক্ত করছে।

বাধা ও চ্যালেঞ্জ

দক্ষিণ এশিয়ার দুর্গম এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ নাজুক। দরিদ্র পরিবারের জন্য স্মার্ট ডিভাইস কেনা কঠিন। লিঙ্গবৈষম্য বড় সমস্যা, যেখানে নারীরা পুরুষের তুলনায় ৪১ শতাংশ কম মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ডিজিটাল বিভাজন দূর না হলে শিক্ষাপ্রযুক্তি উল্টো বৈষম্য বাড়াতে পারে।

টেকসই উদ্যোগের প্রয়োজন

বেশির ভাগ অলাভজনক সংস্থা দাতার অর্থের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ হলো বহুমুখী অর্থায়নের মডেল তৈরি করা। সরকারি অর্থায়ন, নিজস্ব উদ্যোগ ও কম খরচের সাবস্ক্রিপশন ফি একসঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যাডাপটিভ লার্নিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। গেমভিত্তিক শিক্ষা ও ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্ট তৈরিতে দক্ষ জনবল ও অবকাঠামো দরকার।

উজ্জ্বল ভবিষ্যতের রূপরেখা

ইন্টারনেটকে জরুরি সেবা হিসেবে গণ্য করে গ্রামে গ্রামে শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ডিভাইস ও ইন্টারনেটের খরচ কমাতে ভর্তুকি বা বিনামূল্যে বিতরণের উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ডিজিটাল শিক্ষার কনটেন্ট স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির আলোকে তৈরি করতে হবে, যা অফলাইনেও ব্যবহারযোগ্য। শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে, কারণ প্রযুক্তি কখনো শিক্ষকের বিকল্প নয়। নিয়মিত নজরদারি ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে কার্যক্রমের ফল মূল্যায়ন করতে হবে। শিক্ষাপ্রযুক্তি যেন শহর-গ্রাম বা নারী-পুরুষের ব্যবধান আরও গভীর না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়া শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন যুগে পা দিয়েছে। সঠিক ইচ্ছা, নীতি ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা সম্ভব। লক্ষকোটি তরুণের হাতের স্মার্টফোন জ্ঞানের জানালা খুলে দিচ্ছে। শিক্ষাপ্রযুক্তির মাধ্যমে সেই জানালাকে সবার জন্য উন্মুক্ত করাই ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক।