পশ্চিমবঙ্গে সব মাদ্রাসার তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ, উদ্বিগ্ন সংখ্যালঘুরা
পশ্চিমবঙ্গে সব মাদ্রাসার তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ, উদ্বেগ

পশ্চিমবঙ্গের সব ধরনের মাদ্রাসার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার। এ লক্ষ্যে জেলার প্রশাসনের কাছে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। আগামী ৫ জুলাইয়ের মধ্যে প্রতিটি জেলার মাদ্রাসা সংক্রান্ত তথ্য রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরে জমা দিতে বলা হয়েছে।

তথ্য সংগ্রহের নির্দেশনা

রাজ্যের প্রধান সচিব পর্যায় থেকে পাঠানো নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি ব্লক ও পৌর এলাকায় কী ধরনের মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে কত শিক্ষার্থী পড়ছে, কী ধরনের পাঠদান হচ্ছে, অবকাঠামোগত অবস্থা কী এবং প্রশাসনিক কাঠামো কেমন, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। সরকারি অনুমোদিত, স্বীকৃত, অনুদানপ্রাপ্ত, অনুদানবিহীন, বেসরকারি এবং নিবন্ধনবিহীন সব ধরনের মাদ্রাসাকে এই তথ্য সংগ্রহের আওতায় আনা হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সংখ্যালঘু সমাজের একটি অংশে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শিক্ষা দপ্তরের তথ্য

রাজ্যের শিক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক সংখ্যালঘু শিক্ষার্থী সাধারণ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। মাদ্রাসা শিক্ষায় যুক্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীর তুলনায় অনেক কম। সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত মাদ্রাসাগুলোতে শুধু মুসলিম শিক্ষার্থী নয়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অমুসলিম শিক্ষার্থীও পড়াশোনা করে। শিক্ষক ও কর্মচারীদের মধ্যেও বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রশাসনের দাবি

রাজ্য প্রশাসনের দাবি, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেওয়া। কোন প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম চলছে, শিক্ষার্থীদের অবস্থা কী এবং কোথায় কী ধরনের উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে, তা যাচাই করতেই তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরের বক্তব্য

সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, মাদ্রাসাগুলোর অবকাঠামো, পাঠক্রম, শিক্ষার মান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সমন্বিত তথ্য সরকারের কাছে নেই। সেই ঘাটতি পূরণ করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতে পারে। তবে নির্দেশনায় একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, তথ্য সংগ্রহের পর কোনো প্রতিষ্ঠানে অসঙ্গতি বা বেআইনি কার্যক্রমের অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই অংশটিকেই কেন্দ্র করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি মনে করছেন, প্রশাসনিক পর্যালোচনার আড়ালে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি নজরদারির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার ধরন

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে তিন ধরনের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে। প্রথমত, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয়ত, স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কিন্তু অনুদানবিহীন মাদ্রাসা। তৃতীয়ত, খারিজি মাদ্রাসা, যেখানে মূলত ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে ছয় শতাধিক সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত মাদ্রাসা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি আরবি ভাষা ও ইসলামি ধর্মতত্ত্ব পড়ানো হয়। এছাড়া শত শত স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অনুদানবিহীন মাদ্রাসাও পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে খারিজি মাদ্রাসাগুলো সাধারণত স্থানীয় জনগণের অনুদানে পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে কুরআন শিক্ষা, নামাজ, রোজা ও ইসলামি জীবনব্যবস্থা সম্পর্কিত পাঠদান করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দরিদ্র ও এতিম শিশুরাই সেখানে পড়াশোনা করে।

খারিজি মাদ্রাসার তথ্যের অভাব

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের মতে, রাজ্যের খারিজি মাদ্রাসাগুলোর বড় অংশ কোনো সরকারি শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত নয়। ফলে তাদের প্রকৃত সংখ্যা, শিক্ষার্থী সংখ্যা এবং প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে সরকারের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে সেই চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

সংখ্যালঘু সংগঠনের দাবি

তবে সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর দাবি, তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া যেন কোনোভাবেই হয়রানি বা অযাচিত চাপ সৃষ্টির কারণ না হয়। তারা বলছেন, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের স্বার্থে তথ্য সংগ্রহ গ্রহণযোগ্য হলেও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সম্মান জানানো জরুরি। এদিকে রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার যেখানে প্রশাসনিক প্রয়োজনের কথা বলছে, সেখানে বিরোধী ও সংখ্যালঘু মহলের একটি অংশ বিষয়টিকে গভীর পর্যবেক্ষণের চোখে দেখছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে তথ্য সংগ্রহের কাজ কীভাবে এগোয় এবং তার ভিত্তিতে সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।