কারিগরি শিক্ষাই ভবিষ্যৎ: দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার নতুন নীতি
কারিগরি শিক্ষাই ভবিষ্যৎ: দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার নতুন নীতি

বাংলাদেশের মতো তরুণ জনগোষ্ঠী নির্ভর দেশে কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) অধ্যাপক মো. রিদওয়ানুল হক। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী। অর্থনীতির ভাষায় এটিই জনমিতিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। কিন্তু এই সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। একটি প্রজন্ম একবারই তরুণ থাকে। তাই এই সময়ে যদি আমরা আমাদের তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারি, তাহলে যে সম্ভাবনা আজ আশীর্বাদ, সেটিই আগামী দিনে আমাদের জন্য চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।’

শিক্ষা ও শ্রমবাজারের অমিল

বর্তমানে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষা শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একদিকে বহু শিক্ষিত তরুণ উপযুক্ত কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না, অন্যদিকে শিল্প খাত বলছে—তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতার কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। অধ্যাপক রিদওয়ানুল হকের মতে, ‘সমস্যাটি শুধু চাকরির নয়; সমস্যাটি দক্ষতার অমিলের।’ তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ এখনো এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি, যেখানে সনদ অর্জনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ওপর তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও শিল্পের চাহিদা পূরণ করতে পারেন না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নতুন নীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

নতুন কারিগরি শিক্ষা নীতি প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রমবাজার এবং শিল্পনীতির ওপর কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছি—বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বাধা সম্পদের অভাব নয়; দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি।’ নীতি প্রণয়নের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে দেখেছেন। নীতি প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি নিয়মিত অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং একাধিক পর্যায়ে অধ্যাপক রিদওয়ানুল হকের কাছ থেকে উপস্থাপনা গ্রহণ করেছেন। এছাড়া ড. মাহদী আমিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তাঁর সমন্বয়, গবেষণা এবং নীতি-প্রস্তুতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

অধ্যাপক রিদওয়ানুল হকের মতে, এই নীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কোনো একটি নতুন কোর্স বা নতুন প্রতিষ্ঠান নয়; বরং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার বাইরে একটি আলাদা পথ হিসেবে দেখেছি। ফলে অনেক শিক্ষার্থী মনে করতেন, কারিগরি শিক্ষা বেছে নিলে ভবিষ্যতের সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে। নতুন নীতি সেই ধারণা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে।’ এখানে শিক্ষা আর দুই ভাগে বিভক্ত নয়—একদিকে সাধারণ শিক্ষা, অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা। বরং একজন শিক্ষার্থী ধাপে ধাপে দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন, কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারবেন এবং পরে আবার উচ্চশিক্ষায় ফিরে আসার সুযোগও পাবেন। অর্থাৎ শেখার পথ আর একমুখী নয়; এটি হবে নমনীয় ও আজীবন চলমান।

শিল্প খাতের অংশীদারত্ব

আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো, শিল্প খাতকে এই ব্যবস্থার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখা হয়েছে। এত দিন পাঠ্যক্রম অনেকটাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে তৈরি হতো। এখন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নিয়োগদাতা এবং শিক্ষাবিদ—সবাই মিলে নির্ধারণ করবেন ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে কী ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন। অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক বলেন, ‘এই নীতির অন্যতম বড় অর্জন হলো টিভিইটি (কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ)-কে ইতিবাচকভাবে পুনঃব্র্যান্ডিং করা। দীর্ঘদিন আমাদের সমাজে কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারার বাইরে একটি বিকল্প শিক্ষা হিসেবে দেখা হতো। নতুন নীতি সেই ধারণা পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছে। ইতিমধ্যে আমরা এর প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের মূলধারার পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক ও কারিগরি বিষয়গুলোকে ধীরে ধীরে অন্তর্ভুক্ত করছে।’

চাকরি না পাওয়ার কারণ ও প্রতিকার

অনেক তরুণ কারিগরি শিক্ষা শেষ করেও চাকরি পান না—এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক বলেন, ‘এটি আমাদের শ্রমবাজারের একটি বাস্তব চিত্র এবং বিষয়টি নিয়ে আবেগ নয়, বাস্তবতা দিয়ে ভাবতে হবে।’ তিনি সমস্যাটিকে শুধু কর্মসংস্থানের সমস্যা হিসেবে দেখেন না; এটি মূলত দক্ষতার অমিলের সমস্যা। অনেক তরুণ নিষ্ঠার সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা সম্পন্ন করেন, কিন্তু শিল্প খাত যে ধরনের দক্ষতা প্রত্যাশা করে, অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রশিক্ষণ তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। তিনি এমন ঘটনার উল্লেখ করেন, যেখানে একটি অফিস সহায়ক পদের জন্য প্রকৌশলী, এমবিএ কিংবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা আবেদন করেছেন। এটি শুধু শিক্ষিত বেকারত্বের চিত্র নয়; এটি শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধানেরও প্রতিফলন।

এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য তিনি তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেন। প্রথমত, শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে নিয়মিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। পাঠ্যক্রম তৈরি থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ এবং মূল্যায়ন—সব ক্ষেত্রেই শিল্প খাতকে যুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং অন-দ্য-জব ট্রেনিংকে শিক্ষাব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই ক্যারিয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, সমস্যাটি তরুণদের নয়; সমস্যাটি ব্যবস্থার। সেই ব্যবস্থাকে যদি আমরা গবেষণাভিত্তিক, শিল্প-সংযুক্ত এবং বাস্তবমুখী করতে পারি, তাহলে কারিগরি শিক্ষা শেষ করার পর কর্মসংস্থানের সুযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।’

সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের ভূমিকা

এই উদ্যোগ সফল করতে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাতের ভূমিকা সম্পর্কে অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক বলেন, ‘আমার মতে, এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে তিনটি পক্ষের যৌথ দায়িত্ববোধের ওপর—সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাত। এদের মধ্যে কোনো একটি অংশ দুর্বল হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব হবে না।’ সরকারের ভূমিকা হবে নীতি নির্ধারণ, মান নিশ্চিত করা, অর্থায়ন এবং একটি কার্যকর সমন্বয় কাঠামো গড়ে তোলা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আরও বড়, কারণ দক্ষতা তৈরির কাজটি সেখান থেকেই শুরু হয়। আধুনিক ল্যাব, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, গবেষণার পরিবেশ এবং শিল্প-সংযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। অন্যদিকে শিল্প খাতকেও দায়িত্ব নিতে হবে—পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং প্রশিক্ষণের মতো বিষয়গুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি মানসিকতার পরিবর্তনকে চিহ্নিত করেন। ‘এখনো অনেকেই মনে করেন, কারিগরি শিক্ষা মানেই কম মেধাবীদের জন্য শিক্ষা। এই ধারণার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। যেদিন আমরা কারিগরি শিক্ষাকে দ্বিতীয় সারির শিক্ষা না ভেবে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে দেখব, সেদিনই প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হবে,’ বলেন তিনি।

তরুণদের উদ্দেশে বার্তা

দেশের তরুণদের উদ্দেশে অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের তরুণদের খুব আশাবাদী চোখে দেখি। কারণ, আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তারাই। তবে আজকের পৃথিবীতে শুধু একটি ডিগ্রি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে না। ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে একজন মানুষ কী জানেন, কী করতে পারেন এবং কত দ্রুত নতুন কিছু শিখতে পারেন।’ তিনি তরুণদের তিনটি বিষয় মনে রাখতে বলেন। প্রথমত, একটি বাস্তব দক্ষতা অর্জন করুন, সেটা প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন, ডিজাইন, নির্মাণ, কৃষি কিংবা অন্য যেকোনো ক্ষেত্র হতে পারে। দক্ষতা এমন একটি সম্পদ, যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিকে ভয় পাবেন না—এআই কিংবা নতুন প্রযুক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখুন। তৃতীয়ত, বিদেশি ভাষা শেখার ওপর গুরুত্ব দিন। বিভিন্ন অঞ্চলের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্যের জন্য আরবি, পূর্ব এশিয়ার জন্য জাপানি বা কোরিয়ান, ইউরোপের জন্য ইংরেজির পাশাপাশি জার্মানসহ অন্যান্য ভাষা শেখার সুযোগ বাড়ানো দরকার।

সবশেষে তিনি বলেন, ‘নিজেকে শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গড়ে তুলবেন না। নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করুন, যাতে একদিন আপনি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন।’