মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সাটুরিয়া-দড়গ্রাম সড়কে নির্মাণাধীন একটি সেতুর কার্যকাল দুই বছর নির্ধারিত থাকলেও আড়াই বছর পেরিয়ে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি মাত্র ৩০ শতাংশ। দীর্ঘসূত্রিতা, ধীরগতির নির্মাণকাজ এবং বারবার সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ।
প্রকল্পের বিবরণ ও বিলম্ব
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সাটুরিয়া উপজেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাটুরিয়া বাজারের পাশ দিয়ে প্রবাহিত গাজীখালী খালের ওপর এই সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৩ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ৪ কোটি ৮৩ লাখ ৬৭ হাজার ৯০৪ টাকা ব্যয়ে সেতুটির নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পান খাগড়াছড়ির একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে বাস্তবে চিত্র ভিন্ন।
স্থানীয়দের দাবি, নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরুই হয়নি। মাঝে মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক ও প্রতিনিধিদের সেতু এলাকায় দেখা গেলেও কয়েক দিন ধীরগতিতে কাজ চালিয়ে আবার দীর্ঘ সময়ের জন্য কাজ বন্ধ থাকে। এভাবে নানা অজুহাতে সময় পার হলেও নির্মাণকাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
সরেজমিন পরিস্থিতি
সরেজমিন দেখা যায়, সেতুর বেশিরভাগ অংশ এখনো অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কোথাও কোথাও কাজের চিহ্ন থাকলেও পূর্ণাঙ্গ নির্মাণকাজের তৎপরতা চোখে পড়েনি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও সেতুর ৩০ শতাংশ কাজও সম্পন্ন হয়নি।
সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি
এদিকে প্রকল্পের কাজ শেষ না হলেও এরই মধ্যে দুই দফায় সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে প্রথমে মেয়াদ বাড়ানো হয়। পরবর্তীতে আবারও সময় বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকল্প ব্যয়ও সংশোধন করা হয়; কিন্তু অতিরিক্ত সময় ও অর্থ বরাদ্দের পরও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের প্রশ্ন, কাজের অগ্রগতি না থাকলেও বারবার সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা কোথায়?
স্থানীয়দের ভোগান্তি
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, প্রথমে শুনেছিলাম দ্রুত সেতুর কাজ হবে; কিন্তু বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে, কাজ আর শেষ হয় না। মাঝে মাঝে কয়েকজন লোক এসে কাজ করে আবার চলে যায়। এতে আমাদের দুর্ভোগই বাড়ছে।
ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন বলেন, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ কারণে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীসহ প্রতিদিন শত শত মানুষকে এই সড়কে চলাচল করতে হয়। সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় শিক্ষার্থী ও লোকজনসহ যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়ছে। মানুষকে ঘুরপথে যেতে হচ্ছে, সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে।
এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। বর্ষার সময় কাদা ও পানির কারণে চলাচল আরও কঠিন হয়ে যায়। তখন দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
তদারকির অভাব ও দুর্ঘটনা
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে তদারকির ঘাটতি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সময়মতো কাজ শেষ হলে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর হতো; কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে জনগণের ভোগান্তি আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
এদিকে নির্মাণাধীন সেতুর পাশ দিয়ে তৈরি করা বিকল্প সড়কটিও এখন জনদুর্ভোগের আরেক কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ এই বিকল্প সড়কে প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতিনিয়ত পণ্যবোঝাই বড় বড় ট্রাক এই বিকল্প সড়কের ঢাল ওঠার সময় উলটে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রায় এক বছর আগে ওই সড়কে একটি পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গেলে ঘটনাস্থলেই ট্রাক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এরপরও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত সেতুর কাজ শেষ না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
প্রকৌশলীর বক্তব্য
এ বিষয়ে সাটুরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী আ. আজিজ বলেন, আমি কয়েক দিন হলো এসেছি। সেতুর নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। বিভিন্ন কারণে কাজের গতি কিছুটা ধীর হয়েছে। প্রকল্পের সময় ও ব্যয় সংশোধনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে করা হয়েছে। আমরা নিয়মিত কাজ তদারকি করছি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি নির্ধারিত বর্ধিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।



