মৌলভীবাজার সদর উপজেলার অলহা গ্রামে অবস্থিত শতবর্ষী এক হাট ধীরে ধীরে হারাতে বসেছে তার পুরোনো জৌলুশ ও ঐতিহ্য। ছাউনির অভাবে বিক্রেতারা রোদে পুড়ছেন, বৃষ্টিতে ভিজছেন। ক্রেতার সংখ্যাও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
অলহা হাটের অবস্থান ও ইতিহাস
হাটটির নাম ‘অলহা’। তবে অনেকের কাছে এটি ‘বাবুর বাজার’ নামেও পরিচিত। এলাকার নাম অলহা হওয়ায় এক নামে, আর স্থানীয় হিন্দু জমিদারদের উদ্যোগে গড়ে ওঠায় অন্য নামে পরিচিতি পেয়েছে এই হাট। বর্তমানে অলহা নামটিই বেশি প্রচলিত। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আমতৈল ইউনিয়নে, মৌলভীবাজার-কাগাবলা সড়কের পাশে অবস্থিত হাটটি বহু প্রজন্ম ধরে এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে।
স্থানীয়দের মতে, জমিদার বিনোদ বিহারী গুপ্ত ও সুকোমল গুপ্তের পূর্বপুরুষেরা এই হাট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শুরুতে হাটটি দিঘির পশ্চিম, উত্তর ও পূর্ব পাড়জুড়ে ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি এসে স্থায়ীভাবে দিঘির পূর্ব পাড়ে গড়ে ওঠে। স্থানীয়দের ধারণা, হাটটির বয়স শত বছরের অনেক বেশি। আর বটগাছটির বয়স হতে পারে ৩০০ থেকে ৪০০ বছর।
ছাউনির অভাবে বাজার খালি
হাটের পশ্চিমে আছে একটি বিশাল দিঘি। সন্ধ্যার আলোয় এর টলমলে জল চিকচিক করে। আর হাটের প্রায় মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল বটগাছ। কত বছর ধরে সে এখানে ছায়া বিলিয়ে যাচ্ছে, তার সঠিক হিসাব কেউ জানেন না। গ্রীষ্মের তীব্র রোদে কিংবা হালকা বৃষ্টিতে এই বটগাছই হয়ে ওঠে ক্রেতা-বিক্রেতাদের একমাত্র আশ্রয়।
হাটের আর কোথাও কোনো ছাউনি নেই। পুরো বাজারই খোলা আকাশের নিচে। ফলে বিক্রেতাদের রোদে পুড়তে হয়, বৃষ্টিতে ভিজতে হয়। ছাউনির অভাবে বাজারের বড় একটি অংশ এখন খালি পড়ে আছে; সেখানে জন্মেছে ঘাস। অনেক ক্রেতাও আর আগের মতো এই বাজারমুখী হন না।
বিক্রেতাদের অভিজ্ঞতা
প্রায় ৪০ বছর ধরে হাটে সবজি বিক্রি করছেন রণধীর দেব। তাঁর আগে একই ব্যবসা করতেন তাঁর বাবা। তিনি বলেন, “মানুষ এসে দাঁড়াতে পারে না, এ জন্য অনেকে আসে না। বৃষ্টি হলে সব ফেলে দৌড় দিতে হয়। এটা ব্রিটিশ আমলের বাজার। আগে বাবা ব্যবসা করেছেন, এখন তিনি করছেন।” তাঁর দাবি, ছাউনির ব্যবস্থা হলে বাজার আবার জমে উঠবে।
স্থানীয় বাসিন্দা কয়েস মিয়া বলেন, “আগের মতো বাজার জমে না। ঘর-দুয়ার নেই। ব্যবসায়ীরা বসে ব্যবসা করতে পারেন না। বৃষ্টি এলে বসার জায়গা থাকে না। রাস্তাঘাট পাকা হওয়ার পর মানুষ শহরমুখী হয়ে গেছে।”
বর্তমান অবস্থা
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে হাটটিতে গিয়ে দেখা যায়, তখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি। মূলত বিকেল চারটার পর থেকে লোকজন আসতে শুরু করেন। বাড়ির ও খেতের কাজ শেষ করেই গ্রামের মানুষ হাটে আসেন। এর আগেই মাছ, সবজি, শুঁটকি, পান-সুপারিসহ নানা পণ্য নিয়ে বিক্রেতারা এসে বসে পড়েন। আগে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসত। এখন রোব, বুধ ও বৃহস্পতিবার—এই তিন দিন বসে সাপ্তাহিক হাট।
হাটে তখন বিক্রেতার সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ৩০-৪০ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করে আসছেন। আধুনিকতার ছোঁয়াও কিছুটা এসেছে—ঝালমুড়ি, নুডলস ও পাস্তার ভ্রাম্যমাণ দোকানও দেখা যায়। তবু পুরো হাটজুড়ে তখনো ছিল একধরনের আলগা, ধীরস্থির পরিবেশ। কেউ কেনাকাটা করছেন, কেউ আড্ডা দিচ্ছেন, কেউ শুধু সময় কাটাতে এসেছেন।
স্থানীয়ভাবে তৈরি নুডলস ও পাস্তা নিয়ে ভ্যানে করে এসেছেন মো. হৃদয় মিয়া। তিনি বলেন, “গ্রামে গ্রামে ফেরি করে এসব বিক্রি করেন। প্রতি ১৫ দিনে একবার অলহা বাজারে আসি।”
উপসংহার
আগের সেই জমজমাট অবস্থা হয়তো আর নেই। তবু শতাব্দীপ্রাচীন অলহা হাট এখনো টিকে আছে—শুধু ঐতিহ্যের কারণে নয়, মানুষের ভালোবাসার কারণেও। আর সেই ভালোবাসার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী বটগাছটি।



