বিএনপির প্রশাসক নিয়োগে স্থানীয় সরকার কলুষিত: শফিকুর রহমানের তীব্র অভিযোগ
বিএনপির প্রশাসক নিয়োগে স্থানীয় সরকার কলুষিত: শফিকুর রহমান

বিএনপির প্রশাসক নিয়োগে স্থানীয় সরকার কলুষিত: শফিকুর রহমানের তীব্র অভিযোগ

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেছেন, বিএনপি স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে পুরো ব্যবস্থাকে কলুষিত করেছে। বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ উত্থাপন করেন।

একদলীয়করণের পথে বাংলাদেশ: শফিকুর রহমানের সতর্কবার্তা

শফিকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "আমরা গভীরভাবে আশঙ্কা করছি, এইভাবে বাংলাদেশের সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে একদলীয় দলীয়করণ করা হবে। কার্যত এই প্রক্রিয়া হবে আরেকটি ফ্যাসিজমের জন্মদান।" তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিএনপি তাদের নিজস্ব ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব এবং নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিল যে, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে কেবলমাত্র নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মৃত্যু বা আদালতের দণ্ডের ক্ষেত্রেই প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। কিন্তু বর্তমানে তারা কোন যুক্তি ছাড়াই প্রশাসক বসিয়েছে এবং এই কাজের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার নির্লজ্জ দলীয়করণ সম্পন্ন করেছে।

সংসদীয় কার্যক্রম ও বিরোধী দলের আপত্তি

জামায়াতের আমির আরও উল্লেখ করেন যে, বৃহস্পতিবার সংসদে বেশ কয়েকটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, "কিছু বিল জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট হওয়ায় সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে কিছু বিলে জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ, সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার সীমিত করা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার সুস্পষ্ট পাঁয়তারা রয়েছে।" বিরোধী দল এইসব বিলের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে আপত্তি জানিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংসদীয় কার্যক্রমে সময় বণ্টন নিয়েও শফিকুর রহমান তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সরকারি দলীয় সদস্যদের অফুরন্ত সময় দেওয়া হচ্ছে অন্যদিকে বিরোধী দলীয় সদস্যদের সময় সীমিত রাখা হচ্ছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, "একজনকে মাত্র দুই মিনিট সময় দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে অন্যজনকে আনলিমিটেড সময় দেওয়া হচ্ছে—এই বৈষম্যমূলক বিষয়টি নিয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। যদিও পরে বিরোধী দলের সময় কিছুটা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু সেটি কঠোরভাবে ১০ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। অথচ মন্ত্রীদের জন্য কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।"

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দল একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন বিচার বিভাগ দেখতে চায়। তিনি বলেন, "এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং একটি স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। ইতিমধ্যে একটি রায়ের মাধ্যমে এই বিষয়টি জনগণের সামনে স্পষ্ট হয়ে এসেছে। আমাদের সংবিধান এবং সর্বশেষ রায় উভয়ই নির্দেশ দিচ্ছে যে, এই দুটি ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করা সম্পূর্ণ অন্যায়।"

তিনি বিএনপির বিচারক নিয়োগের যুক্তির সমালোচনা করে বলেন, "বিএনপি নিজেই প্রমাণ করেছে যে, অতীতে দলীয় বিবেচনায় যাদের বিচারপতি নিয়োগ করা হয়েছিল, তাদের হাতেই বিচারপতি খায়রুল হক, বিচারপতি মানিক এবং শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ ইনায়েতুর রহিমের মতো ব্যক্তিদের জন্ম হয়েছে। তারা নিজেরাই এই সত্য স্বীকার করেছেন।" শফিকুর রহমান সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি বিচার বিভাগের নিয়োগ নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বের মধ্যে থাকে, তবে বিচার বিভাগে এই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে এবং সাধারণ জনগণ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে

ফ্যাসিজমের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা

শফিকুর রহমান অতীতের অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে বলেন, "অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, সেখানে নির্বাহী বিভাগের কোনো প্রভাব ছিল না। কিন্তু বিএনপি এখন পুরনো পদ্ধতিতে ফিরে গিয়ে প্রমাণ করছে যে, হাসিনা খারাপ কিন্তু হাসিনার নীতি ভালো। যে পদ্ধতি একসময় ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছিল, সেই একই পদ্ধতি আবার বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ফিরে আসুক—বিরোধী দল কখনোই তা চায় না।"

শেরপুর ও বগুড়ার দুটি আসনে নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "১৯৯৪ সালে মাগুরায় যা হয়েছিল, এবার বগুড়ায় ঠিক তাই হয়েছে। শুধুমাত্র স্থানের নাম পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু কার্যপদ্ধতি সম্পূর্ণ একই রকম রয়েছে।" তিনি দলীয় সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, তারা রাষ্ট্রীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছিল, কিন্তু আজকের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন

ওয়াকআউটের কারণ ও বিরোধী দলের অবস্থান

সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার বিষয়ক অধ্যাদেশ, স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ এবং বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র সচিবালয় অধ্যাদেশগুলো বাতিল করে দিচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, "এছাড়া বিরোধী দলের যৌক্তিক আপত্তি থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য কিছু অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হচ্ছে। এই সমস্ত কারণে বিরোধী দল সাময়িক ওয়াকআউট করতে বাধ্য হয়েছে।"

নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন যে, গণবিরোধী কিছু আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংসদকে কলুষিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, "এই ধরনের কাজের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করা হচ্ছে এবং জনগণের আস্থা হ্রাস পাচ্ছে।"

শফিকুর রহমান শেষে একটি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, "প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে, যেই লাউ সেই কদু। এতদিন পর্যন্ত বিএনপির সমস্ত বুলি ছিল মানুষকে ধোঁকা দেওয়া এবং প্রতারণা করা। তারা সেই একই ফ্যাসিজমের পথে অগ্রসর হচ্ছে।" তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, দেশবাসী আগের ফ্যাসিজমকে রুখে দিয়েছিল, নতুন করে ফ্যাসিজম প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে জনগণকে সঙ্গে নিয়েই তাদেরকেও রুখে দেওয়া হবে