স্থানীয় নির্বাচনে ফিরতে কৌশল খুঁজছে আওয়ামী লীগ, আইনজীবী সমিতিতেও আশা
স্থানীয় নির্বাচনে ফিরতে কৌশল খুঁজছে আওয়ামী লীগ

স্থানীয় নির্বাচনে ফিরতে কৌশল খুঁজছে আওয়ামী লীগ

রাজধানী গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের ভেঙে ফেলা কার্যালয়ের পর দলটি এখন নতুন পথে হাঁটছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা আওয়ামী লীগ নতুন কৌশল সাজাচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাইরে থাকা দলটি এখন সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ—এই চার স্তরের নির্বাচনে কীভাবে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেই পরিকল্পনা খুঁজছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরে আসা।

আত্মগোপনে থাকা নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ

আত্মগোপনে থাকা এবং দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দলটির এমন চিন্তা-কৌশলের কথা জানা গেছে। দলটির দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, স্থানীয় নির্বাচনের পাশাপাশি তাদের আরেকটি লক্ষ্য পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন। বিশেষ করে আইনজীবী সমিতিগুলোর নির্বাচনে কিছুটা জায়গা তৈরি করতে চায় তারা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর স্থানীয় সরকারের প্রায় সব স্তরের জনপ্রতিনিধিদের পদ শূন্য হয়ে যায়। এখন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এটাকে রাজনৈতিক ‘এন্ট্রি পয়েন্ট’ হিসেবে দেখছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা। কারণ, এসব নির্বাচনে ব্যক্তিগত প্রভাব, স্থানীয় নানা ইস্যু এবং দলীয় সমর্থন—সবই ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শেখ হাসিনার নির্দেশনা ও প্রস্তুতি

দলীয় একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ভার্চ্যুয়ালি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এর মধ্যে অন্তত দুটি কর্মসূচিতে আত্মগোপনে থাকা নেতা-কর্মীদের দেশে ফেরার তাগিদ দিয়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয় নির্বাচনের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন, পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফিরে আসতে হলে স্থানীয় নির্বাচনে আগে যুক্ত হতে হবে। সে লক্ষ্যেই কারাগারে থাকা নেতা-কর্মীদের জামিনের বিষয়টিতে জোর দেওয়া হবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য সরকার ও আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইনজীবী সমিতিতে আশাবাদ

পেশাজীবী সংগঠন, বিশেষ করে আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সক্রিয় রয়েছে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্যানেলগুলো। গত মাসে কয়েকটি জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ফলাফলে দলটি কিছুটা আশাবাদী হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ১৭টি পদের মধ্যে ৭টি পদে জয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্যানেল। যদিও সভাপতি পদে বিএনপি-সমর্থিত এবং সাধারণ সম্পাদক পদে জামায়াতে ইসলামী-সমর্থিত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এর আগে ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সভাপতিসহ ১০টি পদে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীরা। ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নোয়াখালী জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্যানেল সাধারণ সম্পাদকসহ ৯টি পদে জয়ী হয়েছে। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরে ৮টি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৬টি পদে জয় পেয়েছে।

স্থানীয় নির্বাচনে লক্ষ্য ও চ্যালেঞ্জ

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চালু করেছিল আওয়ামী লীগ সরকারই। এখন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীই মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া উচিত। আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হলে আওয়ামী লীগের জন্য অংশগ্রহণ সহজ হবে। আর দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তবে স্বতন্ত্র হিসেবে ভোট করার সুযোগ থাকবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নেতাদের মতে, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চালু করা আওয়ামী লীগের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এর ফলে তৃণমূলে বিভেদ বেড়েছে এবং দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো একই ভুল করবে না বলেই তাঁদের ধারণা।

সরকারের পরিকল্পনা ও বিশ্লেষণ

সারা দেশে সিটি করপোরেশন আছে ১২টি। এর সব কটিই এখন অনির্বাচিত প্রশাসক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে নিচের স্তর ইউনিয়ন পরিষদ, যার সংখ্যা সাড়ে চার হাজারের বেশি। উপজেলা রয়েছে প্রায় ৫০০টির মতো এবং পৌরসভার সংখ্যা তিন শতাধিক। সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভোট শুরু করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এরপর ধাপে ধাপে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিঃসন্দেহে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের জন্য একটা সুযোগ। দলটির চিহ্নিত এবং গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থানীয় নেতা হয়তো হয়রানির ভয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন না। স্থানীয়ভাবে অনেক জনপ্রিয় ব্যক্তি আছেন যারা নিজ দলের শাসনামলে সুযোগ পাননি। তারা হয়তো এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে মহিউদ্দিন আহমদ এও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ পাবে—এটা ঠিক। তবে জাতীয়ভাবে দলটির রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হবে কীনা তা বলা মুশকিল। কারণ, তাদের পুরো নেতৃত্ব আত্মগোপনে। তাদের মধ্যে অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুশোচনা এখনও দেখা যায়নি। ফলে তাদের জাতীয়ভাবে রাজনীতিতে ফিরতে হলে আরও অনেক কিছু করতে হবে।