খালিয়াজুরীতে উড়াল সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প অনুমোদন, যোগাযোগ বিপ্লবের আশা
খালিয়াজুরীতে উড়াল সেতু প্রকল্প অনুমোদন, যোগাযোগে পরিবর্তন আসছে

খালিয়াজুরীতে উড়াল সেতু প্রকল্প অনুমোদন: যোগাযোগ বিপ্লবের সূচনা

নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলা সদর থেকে উচিতপুর পর্যন্ত প্রস্তাবিত উড়াল সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন পেয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব অঞ্জন দেব রায় বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অনুমোদনের কপি হাতে পেয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

প্রকল্পের মৌলিক তথ্য ও সময়সীমা

প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি টাকা, যার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। উল্লেখ্য, দৈনিক ইত্তেফাকের একাধিক প্রতিবেদনে উড়াল সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প অনুমোদন দেয়।

খালিয়াজুরীর যোগাযোগ সংকট: একটি বিস্তারিত চিত্র

হাওরবেষ্টিত খালিয়াজুরী উপজেলা সদর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। জেলা শহরে যেতে বাসিন্দাদের প্রায় ২০ কিলোমিটার দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে পার্শ্ববর্তী মদন উপজেলার উচিতপুর পৌঁছাতে হয়। এই যাত্রায় একাধিকবার যানবাহন পরিবর্তন করতে হয়, খরচ হয় প্রায় ২০০ টাকা এবং সময় লাগে তিন থেকে চার ঘণ্টা।

স্থানীয় ব্যবসায়ী সোহান-বিন-নবাব বলেন, "অতিরিক্ত খরচ ও দীর্ঘ সময়ের কারণে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধান ও মৎস্যসম্পদ বাজারজাত করতেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।"

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রভাব

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বলেন, দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে খালিয়াজুরীতে চাকরি করা ও বসবাস করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, ফলে প্রাথমিক শিক্ষার হার মাত্র ৩৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আরেফিন আযিম জানান, যোগাযোগ সমস্যার কারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এখানে আসতে অনাগ্রহী। জরুরি রোগীদের সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।

উড়াল সেতুর সম্ভাব্য সুফল

সচেতন মহলের মতে, প্রস্তাবিত উড়াল সেতু নির্মিত হলে নিম্নলিখিত সুবিধাগুলো পাওয়া যেতে পারে:

  • কিশোরগঞ্জের নিকলী ও মিটামইনের মতো পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে খালিয়াজুরীতেও
  • কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতিতে গতি আসবে
  • বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে
  • শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নত হবে

স্থানীয়দের প্রত্যাশা ও উন্নয়নের মাইলফলক

দীর্ঘদিনের যোগাযোগ-বঞ্চিত এই জনপদের উন্নয়নে প্রকল্পটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আশা প্রকাশ করছেন যে উড়াল সেতু নির্মাণের মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে এবং সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে খালিয়াজুরী উপজেলা শুধু নেত্রকোনা জেলারই নয়, সমগ্র হাওর অঞ্চলের উন্নয়নের একটি মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। যোগাযোগ ব্যবস্থার এই রূপান্তর স্থানীয় অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।