উপজেলায় এমপি কক্ষের সিদ্ধান্ত সংবিধান পরিপন্থী: সুজন
উপজেলায় এমপি কক্ষের সিদ্ধান্ত সংবিধান পরিপন্থী: সুজন

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের (এমপি) জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ রাখার সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় পর্যায়ে ‘এমপি রাজ’ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। এটি সংবিধানের পরিপন্থী।

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য

আজ বুধবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘স্থানীয় সরকার বিষয়ে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত: সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আদালতের রায় ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। সুজন এই বৈঠকের আয়োজন করে।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংসদ সদস্যদের কাজ জাতীয় সংসদে, স্থানীয় সরকারে নয়। কিন্তু পরোক্ষভাবে তাঁদের স্থানীয় সরকারের কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করা সংবিধানের লঙ্ঘন। প্রত্যক্ষভাবে যা করা যায় না, পরোক্ষভাবে তা করার চেষ্টা রঙিন আইন বা প্রতারণামূলক ব্যবস্থা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্থানীয় পর্যায়ে দ্বন্দ্বের আশঙ্কা

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে উপজেলা, উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে ইউএনওদের এবং সংসদ সদস্যদেরও দ্বন্দ্ব আছে। সংসদ সদস্যদের পিঁড়িতে বসতে দিলে তাঁরা পুরো পিঁড়ি দখল করবেন। তখন উপজেলার সব প্রতিষ্ঠান দলীয় নিয়ন্ত্রণে যাবে। এতে সরকার ও দলের মধ্যকার বিভাজন দূরীভূত হয়ে যাবে।

সুজন সম্পাদক বলেন, ‘সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতি সরকারি ও বিরোধী দলনির্বিশেষে সব সংসদ সদস্যের স্বার্থপ্রণোদিত সমর্থন হতাশ করেছে। বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভোটাধিকারের মাধ্যমে গঠিত সংসদের কাছ থেকে আমরা অনেক ভালো কিছু আশা করেছিলাম।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জনপ্রতিনিধিদের প্রতি অনুরোধ

জনপ্রতিনিধিদের কাছে অনুরোধ জানিয়ে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আপনারা জনস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সরকারের বর্তমান এবং অন্যান্য সিদ্ধান্তকে মূল্যায়ন করুন এবং জনগণের দোরগোড়ার সরকারকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিন। সরকার যেন জনস্বার্থে কাজ করে, ভুল পথে যেন না যায়।’

সংসদ সদস্যদের বসার জায়গা নিয়ে জারি করা প্রজ্ঞাপন এবং স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগ সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো আদালতের রায়, প্রচলিত আইনকানুন ও বিধিবিধানের পরিপন্থী এবং সুশাসন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে।

স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, স্থানীয় সরকার গণতন্ত্রের ভিত্তি, এই ভিত্তি দুর্বল হলে উপরিকাঠামো শক্তিশালী হবে না। সরকারের কাছে প্রজ্ঞাপন বাতিলের আহ্বান জানিয়ে তিনি দ্রুত আইন পরিশীলিত করে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান। তাঁর মতে, প্রশাসক নিয়োগ ক্ষমতাসীন দলের ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারের পরিপন্থী।

তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা কেন্দ্রীয় সরকারের সমান্তরাল একটি স্বায়ত্তশাসিত ব্যবস্থা হলেও বাংলাদেশে বাস্তবে এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। এখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই হয়ে গেছেন স্থানীয় সরকারের বস।

আইন সংস্কারের প্রস্তাব

সুজন সম্পাদক আরও বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় সরকারকে পাশ কাটানোর প্রবণতা দেখায়। স্থানীয় সরকার-সম্পর্কিত আইনগুলো সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এসব আইন পুরোনো, একে অপরের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ও স্ববিরোধী, যা আধুনিক সময়ের উপযোগী নয়। তাই নির্বাচনের আগে আইনগুলো পরিশীলিত, আধুনিক ও যুগোপযোগী করে পুনর্বিন্যাস করার প্রয়োজন রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে সুজন সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছে জানিয়ে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সম্প্রতি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ বিষয়ে সহায়তার আগ্রহও জানানো হয়েছে।

২০২৪ সালের স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন এবং ২০০৭ সালের সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সরকারের বিবেচনার জন্য ১৩টি বিষয় তুলে ধরেছেন বদিউল আলম মজুমদার। এর মধ্যে আছে পল্লি ও নগর—সব স্তরের স্থানীয় সরকারের জন্য একীভূত আইন প্রণয়ন; নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপসারণের ক্ষমতা সরকারের পরিবর্তে স্বাধীন কমিশন বা ট্রাইব্যুনালের হাতে ন্যস্ত করা; স্বতন্ত্র পেশাদার জনবল কাঠামো গঠন এবং স্থায়ী জাতীয় স্থানীয় সরকার কমিশন প্রতিষ্ঠা।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকারে নারী, শিশু, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি ও তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং উপজেলা পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টিও সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অন্যান্য বক্তব্য

গোলটেবিলে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কবি সোহরাব হাসান বলেন, স্থানীয় সরকারই সুশাসন ও গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র। স্থানীয় সরকার সংবিধানে থাকলেও মননে নেই। জুলাই সনদেও এ ব্যাপারে কোনো প্রস্তাব নেই। এখন যেসব আলামত দেখা যাচ্ছে, আবারও দল ও সরকার একীভূত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সংসদ সদস্যদের বসার জায়গা নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে কোনো মতানৈক্য হয়নি, এ প্রসঙ্গে সোহরাব হাসান বলেন, এর অর্থ স্বার্থ জড়িত থাকলে সমর্থন, আর স্বার্থের সংঘাত হলে বিরোধিতা। সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় সরকার অফিস বা পরিবহনের সুবিধা দিতে পারে, তবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে তাঁদের বসার ব্যবস্থা করে দেওয়া প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার করা হোক।

স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন বর্তমান সরকার কতটা চায়, কবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হবে বা আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন নাগরিক কোয়ালিশনের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর। তিনি বলেন, সংসদ অধিবেশনে অনেক কথা হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলকে কথা বলতে বা সরকারের ওপর চাপ দিতে দেখা যায়নি।

বৈঠকে অন্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন কবি লিলি হক।