কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার দুটি সীমান্তে কাঁটাতারের বাইরে শূন্যরেখায় তিন দিন ধরে খোলা আকাশে অবস্থান করছেন ৯ নারী-শিশু-পুরুষ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায়ও নোম্যান্স ল্যান্ডে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গানপয়েন্টে মানবেতর জীবনযাপন করতে দেখা গেছে।
পুশইনের চেষ্টা ও বাধা
গত রোববার (১৪ জুন) ভোর ৪টার দিকে ভারতীয় বিএসএফ রৌমারী গয়টাপাড়া ও ভুন্দুর সীমান্ত দিয়ে তাদের অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে। এতে বাধা দেয় বিজিবি ও স্থানীয়রা। পুশইনের সময় ধাওয়া পালটাধাওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন শিশু ও নারীরা। একবার কাঁটাতারের দিকে আরেকবার শূন্যরেখায় ঠেলাঠেলিতে চরম আতঙ্কে ছিল পুশইনের শিকার অসহায় মানুষগুলো।
শিকারদের অবস্থা
গয়টাপাড়া সীমান্তে পুশইনের শিকার ২ জন শিশু, ১ জন নারী ও ২ জন পুরুষ। পুশইনের শিকার সুমি আক্তার বলেন, 'গত তিন দিন ধইরা আমরা এই গরমের মধ্যে এই জায়গাটায় আছি। কোলে ৬ মাসের ও ৪ বছরের শিশুসন্তান রয়েছে। খাবার নাই, পানি নাই, মাথার উপর ছাদ নাই। বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে, কিছুই খাবার দিতে পারছি না। অনেকে বিস্কুট রুটি দিতাছে তাই দিয়ে ক্ষুধা মেটাচ্ছি।'
সুমি আক্তার আরও জানান, ২৭ দিন আগে সিলেট দিয়ে বাবা-মাসহ কাজের সন্ধানে অবৈধপথে ভারত যান। ইন্ডিয়ান পুলিশ টের পেয়ে আমাগো বিএসএফর হাতে তুলে দেয়। এখন আমাদের কেউ নিচ্ছে না।
সুমির স্বামী বেলাল জানান, 'ছোট পোলাপান লইয়া খুব দুর্ভোগে পইরা আছি। পানি নাই, পায়খানা নাই, বউ ছাওয়াল নিয়া খুব অসুবিধায় আছি। দিনের বেলা প্রচণ্ড গরমে বাচ্চা দুইডা অসুস্থ হয়া রইছে। জীবনে অনেক বড় ভুল করছি, বাঁচি থাইকলে এই কাজ আর করুম না। আমাগো বাঁচান। অন্যায় হলে সাজা দেন, তাও বাঁচান।'
গয়টাপাড়া সীমান্ত দিয়ে পুশইনের শিকার ব্যক্তিরা দাবি করেন, তারা বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল গ্রামের বাসিন্দা।
পতাকা বৈঠক ব্যর্থ
এদিকে রোববার (১৪ জুন) সকালে বিজিবি ও বিএসএফের পক্ষ থেকে কোম্পানি পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএসএফ পুশইনের ঘটনাটি অস্বীকার করায় বৈঠকটি সমাধান ছাড়াই ব্যর্থ হয়। বিজিবি অবৈধ পুশইন বন্ধ করে শূন্যরেখায় অবস্থানরত ৯ জনকে ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করলেও বিএসএফ ৩ দিন গড়িয়ে গেলেও সেই ৯ নাগরিককে ফিরিয়ে নেননি।
স্থানীয়দের উদ্বেগ
গয়টাপাড়ার বাসিন্দা ছক্কু মিয়া বলেন, 'তিন দিন হয়ে গেল দুই দেশের কোনো সরকারই তাদের নিচ্ছে না। এরা চরম ঝুঁকির মধ্যে দিন পার করছে। বিষয়টি নিয়ে সীমান্ত পর্যায়ে আলাপ আলোচনা করে অসহায় বাচ্চা দুইটির মুখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত সমাধান হওয়া দরকার।'
রৌমারীর শৌলমারী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সোনা মিয়া জানান, 'কোলের বাচ্চাসহ লোকগুলা খুব কষ্টে খোলা আকাশে দিন পার করছে। গরমে ঘামে বাচ্চা দুটো কাঁদছে। ঠিকমতো খাবার নাই, পানি নাই, টয়লেটের ব্যবস্থা নাই, অন্ধকার রাতে সাপ-বিচ্ছুর ভয়, মশার কামড়ে তাদের যায় যায় অবস্থা। বিএসএফও ফিরিয়ে নিচ্ছে না, সমাধান না হওয়ায় এই বাচ্চাগুলোর বড় একটা বিপদ হয়ে যেতে পারে।'
৬ মাসের শিশুসহ পুশইনের শিকার ৬ জনকে দেখতে সারাদিনই ভিড় জমাচ্ছেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা অসংখ্য নারী-পুরুষ ও শিশু। টানা তিন দিন ধরে বাবা-মায়ের সঙ্গে ৬ মাসের শিশুকে এভাবে আটকিয়ে রাখায় হতবাক সবাই।
বিজিবির অবস্থান
ঘটনার পর থেকে গয়টাপাড়া, ভন্দুরচরসহ রৌমারী উপজেলা সীমান্তে সতর্ক অবস্থানের রয়েছে বিজিবির সঙ্গে স্থানীয়রাও। গয়টাপাড়া বিওপি ক্যাম্পের হাবিলদার মাসুদ রানা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, 'যেকোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে।'
তিনি আরও জানান, 'মূলত রোববার সকাল ৭টার দিকে গয়টাপাড়া সীমান্ত দিয়ে ৬ জন ও ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে ৩ যুবককে বাংলাদেশি সন্দেহে পুশইন করার চেষ্টা করলে বিজিবি ও স্থানীয়রা বাধা দেন। পরে বাঁধার মুখে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডের প্রায় ৫০ গজের ভেতরে সীমান্তের শূন্যরেখা লাগোয়া ভারতের অংশে অবস্থান নেয় তারা।'
জামালপুর ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান উদ্ভূত পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, 'ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে, দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলমান রয়েছে।'



