শূন্যরেখায় আটকে থাকা শিশুদের মায়ের আকুতি: আমাদের বাঁচান
শূন্যরেখায় আটকে থাকা শিশুদের মায়ের আকুতি: বাঁচান

‘আমার শিশুসন্তানরা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাদের চিকিৎসা করা দরকার। ঠিকমতো খাবার খাওয়াতেও পারছি না। তাদের কীভাবে বাঁচাবো? আমরা বাঁচতে চাই।’ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে ছয় মাস আর চার বছরের দুই শিশুসন্তান নিয়ে এভাবেই আকুতি জানালেন সুমি আক্তার। চোখে অসহায়ত্ব, মুখে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছাপ।

শূন্যরেখায় মানবিক বিপর্যয়

সোমবার (১৫ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত নারী-শিশুসহ ভুক্তভোগীরা সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছিলেন। ভারত কিংবা বাংলাদেশ কোনও দেশেই ঠাঁই হয়নি তাদের। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে খোলা আকাশের নিচে গত দুই দিন ধরে নিরুপায় বসে আছেন সুমি আক্তার-বেলাল হোসেন দম্পতি ও তাদের দুই শিশুসন্তানসহ ছয় জন।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইন চেষ্টা আর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও গ্রামবাসীর পুশব্যাক প্রতিরোধে সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে আছে সুমি-বেলাল ও তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুশইন ও পুশব্যাকের ঘটনা

গত রবিবার (১৪ জুন) ভোর ৬টার দিকে উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তপথে নারী-শিশুসহ ছয় জন এবং ইজলামারী সীমান্তপথে আরও তিন জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। কাঁটাতারের এপারে বাংলাদেশ প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হলেও বিজিবি এবং স্থানীয় গ্রামবাসীর বাধায় তাদের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পাঠাতে পারেনি তারা।

সোমবার গয়টাপাড়া সীমান্তে গিয়ে দেখা গেছে, শূন্যরেখার একদিকে বিএসএফ, অরেক দিকে বিজিবি। মাঝখানে দুই শিশুসন্তান নিয়ে অসহায় বসে আছেন সুমি আক্তার-বেলাল হোসেন দম্পতি। সুমির কোলে ছয় মাসের শিশুসন্তান ফাইমা আর বেলালের কোলে চার বছরের ফাতেমা। খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি সয়ে দুই দিন ধরে এভাবে বসে আছেন তারা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভুক্তভোগীদের দাবি

সুমি আক্তার ও বেলালের দাবি, তারা বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল গ্রামের বাসিন্দা। কয়েক মাস আগে সিলেট সীমান্তপথে তারা ভারতে পাড়ি জমান। পরে বিএসএফ তাদের ধরে নিয়ে গত রবিবার ভোরে সীমান্তের কাঁটাতার পার করে দেয়। কিন্তু বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধায় তারা বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে প্রবেশ করতে পারেননি।

শূন্যরেখায় ওই দম্পতির কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি ও বিএসএফের বাধায় সামান্য দূরে অবস্থান করতে হয়। সাংবাদিক দেখতে পেয়ে সুমি বলেন, ‘আমাদের বাঁচান। কোন দেশে নেবেন নেন, কিন্তু এভাবে ফেলায় রাখিয়েন না। বাচ্চাগুলা মরে যাবে। আমরা বাঁচতে চাই।’ এ সময় সন্তানদের কষ্টে কাঁদছিলেন অসহায় এই মা।

বিজিবির বক্তব্য

বিজিবি জানায়, বিএসএফ সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে রৌমারীর দুই সীমান্তপথে নয় জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিরা কাঁটাতারের এপারে শূন্যরেখার কাছে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থান করলেও তাদের ফেরত নেয়নি বিএসএফ। বিজিবিও তাদের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঢুকতে দেয়নি।

বিজিবি আরও জানায়, পুশইন চেষ্টার পর রবিবার দুপুরে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হয়। তবে কোনও সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। বৈঠকে সীমান্তে জড়ো করা ব্যক্তিদের বাংলাদেশের নাগরিক দাবি করে বিএসএফ। ভুক্তভোগী নারী-পুরুষরাও নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক দাবি করেছে। তবে অবৈধ অনুপ্রবেশ করায় তাদের গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় বিজিবি। একইসঙ্গে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।

গয়টাপাড়া বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডার সুবেদার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিরা গতকালের অবস্থানেই আছেন। তারা শূন্যরেখার কাছে ভারতের প্রান্তে রয়েছেন। ওই প্রান্তে বিএসএফ এবং আমাদের প্রান্তে বিজিবি আছে। গতকাল পতাকা বৈঠক হলেও কোনও সুরাহা হয়নি।’

‘অবস্থানকারীদের বিএসএফ কম্বল ও পলিথিন দিয়েছে। খাবারও দিয়েছে। এ ছাড়াও আমাদের এখানকার লোকজন খাবার ও ছাতা দিয়েছে।’ তাদের সহায়তার দেওয়ার প্রশ্নের জবাবে সুবেদার শফিকুল।

শিশুদের অসুস্থতার প্রশ্নের জবাবে এই বিজিবি সদস্য বলেন, ‘এমনিতে তারা ভালো আছে। কিন্তু গরমে একটু সমস্যা হচ্ছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জামালপুর ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, ‘উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিজিবি সীমান্তে জনবল ও নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। স্থানীয় লোকজন বিজিবিকে সহায়তা করছেন। সীমান্তে জড়ো করা নারী-শিশুসহ অন্যরা পূর্বের স্থানেই অবস্থান করছেন। ভারত পুশ করেছে, আমরা আসতে দিইনি। আপাতত আসতে দেবো না যতক্ষণ পর্যন্ত না একটা সমাধানে আসছে।’