মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ফ্লাইট বাতিল, সুযোগে চোরাচালানি বাড়ছে বিমানবন্দরে
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ফ্লাইট বাতিল, চোরাচালানি বাড়ছে

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ফ্লাইট বাতিল, সুযোগে চোরাচালানি বাড়ছে বিমানবন্দরে

মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হওয়া এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রভাবে বিমান চলাচল সীমিত হওয়ায় বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোতে চোরাচালানির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে অবৈধ পণ্য প্রবেশের চেষ্টা করছে এক শ্রেণির সুযোগ-সন্ধানী চোরাকারবারি। সম্প্রতি ধরা পড়া অবৈধ পণ্যের মধ্যে রয়েছে নিষিদ্ধ ক্রিম, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, সিগারেট প্রভৃতি, যা কোটি টাকার বেশি মূল্যমানের।

যুদ্ধের প্রভাবে ফ্লাইট সংকট ও চোরাচালানির সুযোগ

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে প্রায় সাড়ে চারশো ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশে আসার ফ্লাইটও ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এই অস্থির পরিস্থিতিতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং এয়ারলাইন্সগুলো উদ্বিগ্ন থাকলেও, চোরাকারবারিরা বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য শুল্ক ফাঁকি দিয়ে দেশে প্রবেশের চেষ্টায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

বিমানবন্দরে জব্দকৃত পণ্যের বিশদ বিবরণ

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (১১ মার্চ) হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৬৮ লাখ টাকা মূল্যমানের অবৈধ সিগারেট ও আইফোন জব্দ করা হয়েছে। ইতালির রোম থেকে আগত বিজি-৩৫৬ ফ্লাইটের যাত্রী আলমগীর কবিরের লাগেজ থেকে ৪৫টি স্মার্টফোন উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে আইফোন ব্রান্ডের ১৪টি, স্যামস্যাং ব্রান্ডের ১৪টি এবং অন্যান্য ব্রান্ডের ১৭টি স্মার্টফোন রয়েছে। এই মোবাইল ফোনগুলোর আনুমানিক বাজারমূল্য পঞ্চান্ন লক্ষ টাকা। একই দিনে, শারজাহ থেকে আসা ফ্লাইট জি-৯-এর এক যাত্রীর কাছ থেকে ১২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা মূল্যের সিগারেট জব্দ করা হয়।

এরপর বৃহস্পতিবার (১৩ মার্চ) দুবাই থেকে আসা এমিরেটস এয়ারলাইন্সের তিন জন যাত্রীর কাছে থেকে বিশেষ কৌশলে লুকানো ৩০টি আইফোন, ৩টি গুগল পিক্সেল ফোন, ৪টি ল্যাপটপ, এবং ১৪৫ কার্টুন সিগারেট জব্দ করা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য তেতাল্লিশ লাখ ১১ হাজার টাকা।

সোনা পাচারের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা

এদিকে, শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দীর্ঘদিন ধরে নানা রকমের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলছে, যার মধ্যে সোনা পাচার শীর্ষস্থানে রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, আগের তুলনায় সোনা পাচার বেড়ে গেছে এবং প্রায় প্রতিদিনই সোনার চালান ধরা পড়ছে। বিদেশি মাফিয়াদের পাশাপাশি দেশি এজেন্টরাও বেপরোয়াভাবে সোনা চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ছে। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দীর্ঘদিন ধরেই সোনা পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যদিও পাচারকারীদের আটক করা হচ্ছে, কিন্তু অনেকেই জামিন নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে বা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে।

কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ

কাস্টমসের কর্মকর্তারা জানান, পরিস্থিতি যতই জটিল হোক, বিমানবন্দর ব্যবহার করে অবৈধ পণ্য দেশের অভ্যন্তরে নিয়ে আসা খুব কঠিন, কারণ তারা সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছেন। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এসএম রাগিব সামাদ বলেন, "বিমানবন্দর ব্যবহার করে কেউ যেন কোনও অবৈধ পণ্য দেশের অভ্যন্তরে নিয়ে না আসতে পারে, তার জন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে।" গোয়েন্দা সংস্থা, এভসেক, কাস্টমসসহ অন্যান্য বাহিনীও এই বিষয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে, চোরাচালানির এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা রোধে আরও কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের এই সময়ে, যাতে দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।