চট্টগ্রাম বন্দরে ২৫০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কনটেইনার গায়েব, কাস্টমস-বন্দর দ্বন্দ্ব
চট্টগ্রাম বন্দরে ২৫০ কনটেইনার গায়েব, কাস্টমস-বন্দর দ্বন্দ্ব

কাস্টমসের অভিযোগ: ২৫০ কনটেইনারের হদিস নেই

দেশের অন্যতম কঠোর কার্গো ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরে কাস্টমস অপরাধের সন্দেহে চিহ্নিত অন্তত ২৫০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ আমদানি কনটেইনারের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। কাস্টমস বলছে, বন্দরে চার বছর ধরে ‘লক’ অবস্থায় পড়ে থাকা এসব কনটেইনার বিভিন্ন সময়ে গায়েব হয়ে গেছে। এ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)।

কাস্টমসের ভাষ্য, চোরাচালান, মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে অবরুদ্ধ করে রাখা ২৫০টি কনটেইনারের প্রকৃত অবস্থান বন্দরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একাধিকবার চিঠি দিয়েও বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এসব কনটেইনার সম্পর্কে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।

কাস্টমসের বক্তব্য: লক করা কনটেইনার গায়েব

কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে সন্দেহভাজন শত শত আমদানি চালানের ওপর খালাস নিষেধাজ্ঞা বা ‘লক’ আরোপ করা হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যেসব চালানে ঘোষণা-বহির্ভূত পণ্য, চোরাচালান বা শুল্ক ফাঁকির আশঙ্কা ছিল, সেগুলো এসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে লক করা হয়। ফলে আমদানিকারক বিল অব এন্ট্রি দাখিল করলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পণ্য খালাস সম্ভব ছিল না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরবর্তী সময়ে এসব চালানের একটি অংশ আমদানিকারকরা বিভিন্ন বৈধ প্রক্রিয়ায় ডেলিভারি নেন এবং কিছু চালান নিলামে বিক্রি করা হয়। তবে প্রায় ২৫০টি কনটেইনারের ক্ষেত্রে কোনও আমদানিকারক বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেননি। অর্থাৎ চার বছর ধরে এসব কনটেইনার খালাসের কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে কাস্টমসের নিয়ম অনুযায়ী কনটেইনারগুলোর কায়িক পরীক্ষা করে প্রকৃত পণ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তখনই সামনে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। কাগজে-কলমে থাকা এসব কনটেইনারের অনেকগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব বন্দরে পাওয়া যাচ্ছে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কাস্টমসের দেওয়া তথ্যমতে, এসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে লক স্ট্যাটাসে থাকা মোট ২৫০টি কনটেইনারের মধ্যে ২০২১ সালের ৮৩টি, ২০২২ সালের ৬১টি, ২০২৩ সালের ৪০টি এবং ২০২৪ সালের ৬৬টি কনটেইনারের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এসব কনটেইনার কোথায় গেলো, কীভাবে বন্দর থেকে বের হলো- এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে একের পর এক চিঠি দেওয়া হলেও কোনও জবাব পাওয়া যায়নি।

ঘটনার সূত্রপাত: নিলামে কেনা কনটেইনার উধাও

পুরো বিষয়টি আলোচনায় আসে একটি নিলামকে কেন্দ্র করে। ২০২৫ সালে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা দুই কনটেইনার কাপড় নিলামে তোলে কাস্টমস। ‘শাহ আমানত ট্রেডিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান নিলামে অংশ নিয়ে কনটেইনার দুটি কেনে এবং সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে বন্দরের ইয়ার্ডে গিয়ে তারা ওই দুই কনটেইনারের কোনও অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। তখনই কাস্টমস হাউস লক অবস্থায় থাকা অন্যান্য কনটেইনারের অবস্থান যাচাই শুরু করে। সেই অনুসন্ধানেই নথিপত্রের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ধরনের অমিল ধরা পড়ে।

এ বিষয়ে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কাস্টমসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (এআইআর) শাখা বন্দর কর্তৃপক্ষকে সর্বশেষ তাগিদপত্র পাঠায়। এর আগে একই বিষয়ে অন্তত চারটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাস্টমসের অভিযোগ, বন্দর কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন এসব চিঠির জবাব দেয়নি কিংবা কনটেইনারগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানায়নি।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের ডেপুটি কমিশনার তারেক মাহমুদ স্বাক্ষরিত সর্বশেষ চিঠিতে বলা হয়, ‘উপর্যুক্ত বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ পূর্বক জানানো যাচ্ছে যে, চোরাচালান ও রাজস্ব ফাঁকির গোপন সংবাদ থাকায় কাস্টমস হাউস চট্টগ্রামের এআইআর শাখা কর্তৃক এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম-এ ২০২১, ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে কতিপয় পণ্য চালানের খালাস স্থগিত (লক) করা হয়। এর মধ্যে ২০২১ সালে ৮৩টি, ২০২২ সালে ৬১টি, ২০২৩ সালে ৪০টি এবং ২০২৪ সালে ৬৬টি বি/ই অদ্যাবধি এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে লক অবস্থায় রয়েছে। ওসব কনটেইনারের অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য সূত্রোক্ত পত্রসমূহের মাধ্যমে অনুরোধ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কনটেইনারগুলোর অবস্থান এখনও জানানো হয়নি। জাতীয় রাজস্ব সুরক্ষার স্বার্থে এআইআর শাখার লককৃত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত বি/ই ভুক্ত পণ্য চালানের কনটেইনারগুলোর বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করে এই দফতরকে অবহিত করার জন্য পুনরায় অনুরোধ করা হলো।’

এ ব্যাপারে কাস্টমসের এআইআর শাখার ডেপুটি কমিশনার তারেক মাহমুদ সোমবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘লক করা ২৫০টি কনটেইনারের হদিস মিলছে না। আমরা বলতে পারছি না কনটেইনারগুলোর অবস্থান কোথায়। এ বিষয়ে জানতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দিয়েও কোনও সাড়া পাচ্ছি না।’

কীভাবে গায়েব হলো কনটেইনার?

তবে অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকার পরও–দেশের অন্যতম সুরক্ষিত নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে কীভাবে এসব কনটেইনার বাইরে চলে যেতে পারে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কাস্টমস এজেন্টদের মতে, সাধারণত একটি পূর্ণ কনটেইনার (এফসিএল) খালাস করতে বন্দর কর্তৃপক্ষের ওয়ান স্টপ সার্ভিস, টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ, ইয়ার্ড কর্মকর্তা, ডেলিভারি স্টাফ এবং কাস্টমস গেট কর্মীসহ বিভিন্ন দফতরের প্রায় ২৪টি পৃথক স্বাক্ষর ও অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।

তদন্তকারীদের ধারণা, এই সমস্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে জাল স্বাক্ষর, ভুয়া সিল ও জাল করা গেট পাস ব্যবহার করা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ডিজিটালাইজেশনের চেষ্টা সত্ত্বেও এই ব্যবস্থাটি এখনও যে কতটা ম্যানুয়াল বা সনাতনী যাচাইকরণের ওপর নির্ভরশীল এবং এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর, তা এসব জালিয়াতির মধ্যে দিয়ে উন্মোচিত হয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা: তথ্য অনুমাননির্ভর

তবে এসব অভিযোগের জবাবে সোমবার (৬ জুলাই) বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. নাসির উদ্দিন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কাস্টমস ২৫০টি পণ্য চালানের কথা বললেও প্রকৃত সংখ্যা ২৪৭টি। এর মধ্যে ১৬৪টি চালান পূর্ণ কনটেইনার (এফসিএল) এবং বাকি ৮৩টি চালান আংশিক কনটেইনার বা এলসিএল কার্গো। ১৬৪টি এফসিএল চালানে মোট ২৯৩টি কনটেইনার রয়েছে। এর মধ্যে কাস্টমসের আউটপাসের মাধ্যমে ৮৮টি কনটেইনার ইতোমধ্যে বৈধভাবে ডেলিভারি দেওয়া হয়েছে। এলজিএম অনুযায়ী ৭০টি কনটেইনার বিভিন্ন বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে রয়েছে ১৩১টি কনটেইনার। কাস্টমসের পাঠানো তালিকায় চারটি কনটেইনার নম্বর ভুল ডিজিট বা ভুল প্রিফিক্সে উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এলসিএল কার্গোর বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, ৮৩টি চালানের মধ্যে আটটি কাস্টমসের আউটপাসের মাধ্যমে ডেলিভারি হয়েছে। ৩৫টি চালান এখনও বন্দরের বিভিন্ন সিএফএস ও শেডে রয়েছে। বাকি ৪০টি চালানের ক্ষেত্রে কাস্টমস যে বিল অব লেডিং (বি/এল) নম্বর দিয়েছে, তা সঠিক নয়। ফলে সেসব চালানের সঙ্গে বন্দরের তথ্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

বন্দর কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, সংশ্লিষ্ট কনটেইনার ও কার্গোগুলো বহু আগেই কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে ‘বাই পেপার’ পদ্ধতিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে কাস্টমসকে লিখিতভাবেও জানানো হয়েছে। ফলে কনটেইনার গায়েব হওয়ার অভিযোগ বাস্তবসম্মত নয়।

এ ব্যাপারে জানতে বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. নাসির উদ্দিনকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।