জয়পুরে তেলাপোকা পার্টির নেতাকে চড়-থাপ্পড়, গ্রেপ্তার ৫
জয়পুরে তেলাপোকা পার্টির নেতাকে চড়-থাপ্পড়, গ্রেপ্তার ৫

ভারতের রাজস্থানের জয়পুরে গতকাল সোমবার একটি বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার সময় ‘তেলাপোকা’ দলের (ককরোচ জনতা পার্টি/সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অভিজিৎ দিপকেকে চড়থাপ্পড় মারা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ঘটনার বিবরণ

জয়পুরের শহীদ স্মারকে সিজেপির প্রথম বিক্ষোভ কর্মসূচি চলাকালীন এ ঘটনা ঘটে। অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানোর পর সমর্থকেরা অভিজিৎ দিপকেকে কাঁধে তুলে মঞ্চের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। মাঠে ঢুকে দিপকে যখন জনতার উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছিলেন, তখনই পাঁচ থেকে ছয়জন তাঁকে চড়থাপ্পড় মারতে শুরু করেন এবং লাঞ্ছিত করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

দিপকের প্রতিক্রিয়া

এ ঘটনার পর মঞ্চে উঠে দিপকে বলেন, ‘আমি যখন ভেতরে ঢুকছিলাম, তখন আমার ওপর হামলা করা হয়েছে। আমাদের ওপর যতবারই হামলা হোক না কেন, আমরা হাত তুলব না। শুধু দুর্বলেরাই হাত তোলেন।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এ সময় অভিজিৎ দিপকে তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। দিপকে বলেন, ‘যাঁরা আমার ওপর হাত তুলেছেন, তাঁদের ছেড়ে দিন। আমার অনুরোধ, তাঁদের মারধর করবেন না। তাঁরা আমাদের ওপর হামলা করুক, কিন্তু আমরা হাত তুলব না। আমি আরও দশবার মার খেতে রাজি আছি, কিন্তু কেউ যেন আইন নিজের হাতে না তুলে নেন।’

শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ঘোষণা

অভিজিৎ দিপকে বলেন, এভাবে হামলা করে তাঁর মুখ বন্ধ করা যাবে না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র থেকে যখন তিনি ভারতে ফিরছিলেন, তখনো তিনি জেলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন হবে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।’

পরে এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে দিপকে লেখেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবেই আমাদের কণ্ঠস্বর তুলে যাব। আমি মহাত্মা গান্ধী ও আম্বেদকরের অনুসারী। শান্তি ও ভালোবাসা দিয়েই আমি এ লড়াই চালিয়ে যাব।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অভিযুক্তদের পরিচয়

সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা দাবি করেন, ‘যাঁরা দিপকের ওপর হামলা করেছেন, তাঁরা সবাই একটি জাতীয় রাজনৈতিক দলের কর্মী। তাঁদের শনাক্ত করা গেছে। এসব দুষ্কৃতকারীকে খুব শিগগিরই সবার সামনে উন্মোচন করা হবে।’

হামলার পর পুলিশ যখন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে যাচ্ছিল, তখন রাকেশ গুর্জর নামের এক অভিযুক্ত চিৎকার করে বলেন, ‘এ মশাগুলো ‘জিহাদি’ মানসিকতার লোক। অভিজিৎ মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। প্রশ্ন ফাঁস তো শুধু একটা বাহানা মাত্র।’

অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একজন রাকেশ গুর্জর নিজেকে জয়পুরের একজন জাতীয়তাবাদী হিসেবে দাবি করেন এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন বলে জানান। তবে গুর্জরের সামাজিক মাধ্যমের প্রোফাইল ঘেঁটে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সঙ্গে তাঁর যুক্ত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

জয়পুরের উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) রাজর্ষি রাজ বর্মা বলেন, ‘কিছু ব্যক্তি সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেকে চড় মেরেছিলেন এবং সেখানকার পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করেন। বিক্ষোভস্থলে একটি হাতাহাতি ও বাগ্‌বিতণ্ডার সৃষ্টি হলে সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেন।’

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৭০ ধারায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভুক্তভোগী পক্ষের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।

দিপকের ওপর হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তাঁরা হলেন রোহিত শর্মা (২৫), রাকেশ গুর্জর (৩০), অজয় শর্মা (২৫), কুলদীপ সিং শেখাওয়াত (২৭) ও নিকেত (২৮)।

হামলার সময় সিকিম থেকে এসে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে যোগ দেওয়া ভবেশ অধিকারী নামের আরেক ব্যক্তিও লাঞ্ছিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হাতাহাতির সময় তাঁর মুঠোফোনও হারিয়ে গেছে।

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ক্ষোভ

প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হয়ে যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের স্মরণে দুই মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে ওই বিক্ষোভ-সমাবেশ শুরু হয়।

সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে দিপকে ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থা ও সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘আপনারা একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ঠিকমতো সামলাতে পারেন না, দেশ কীভাবে সামলাবেন? সিবিএসই বোর্ডের অনেক শিক্ষার্থী আমাকে বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছেন যে তাঁদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। তাঁরা কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষা দিলেও তাঁদের ভুল নম্বর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, খাতা পুনর্নিরীক্ষণ করলে তাঁরা সঠিক নম্বর পাবেন। কিন্তু এ পুনর্নিরীক্ষণের জন্য তাঁদের অর্থ দিতে হবে।’

দিপকে বলেন, ‘আমি এ দেশের ব্যবস্থা বুঝতে পারি না। ভুল নম্বর দিল সরকার, আর সেই ভুলের মাশুল দিতে শিক্ষার্থীদের কেন টাকা গুনতে হবে? সরকারের একটু লজ্জা হওয়া উচিত যে প্রথমে নিজেরা ভুল করে, আর পরে সেই ভুল সংশোধনের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেয়। সব খাতা বিনা মূল্যে পুনর্নিরীক্ষণ করা উচিত।’

সরকারের নীতিনির্ধারকদের কটাক্ষ করে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা বলেন, ‘তাঁরা এই সমস্যার গভীরতা বুঝবেন না। কারণ, তাঁরা নিজেরা কখনো স্কুলে যাননি। আপনারা অশিক্ষিত, এই কারণেই কোনো পরীক্ষা সঠিকভাবে নিতে পারেন না।’

দিপকে আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা যখন অনলাইনে পরীক্ষা দিতে যান, তখন প্রায়ই সার্ভার ডাউন বা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। অথচ নির্বাচনের সময় কখনো সার্ভার ডাউন হয় না।’ তিনি বলেন, ‘ইলেকটোরাল বন্ডের এক রুপিও কখনো এদিক-ওদিক বা লিক হয় না, কিন্তু নিট (এনইইটি) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ঠিকই ফাঁস হয়ে যায়। যখনই দেশের এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন আসে, তখনই সবকিছু ফাঁস হয়ে যায়।’

জয়পুর পুলিশের নির্দেশনা মেনে এ সমাবেশে সর্বোচ্চ ৮০০ আন্দোলনকারীর উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তাই দিপকের পেছনে থাকা মঞ্চের বিশাল ব্যানারে বড় অক্ষরে লেখা ছিল ‘শান্তিপূর্ণ প্রদর্শন’। তবে সমাবেশস্থলে বিপুলসংখ্যক ইউটিউবার ও সাংবাদিকদের উপস্থিতির কারণে ভিড় কিছুটা বেশি মনে হচ্ছিল।

দিপকে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানোর আগে ভারতের জাতীয় কবি ও বিপ্লবীদের গান গাওয়া হয়। এ সময় তাঁর চারপাশে থাকা সমর্থকেরা ভারতের জাতীয় পতাকা, আম্বেদকরের ছবি ও ভারতের সংবিধানের অনুলিপি উঁচিয়ে স্লোগান দেন।

শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচনা

নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রসঙ্গে রাজস্থানের শিক্ষামন্ত্রী মদন দিলওয়ারের একটি মন্তব্য তুলে ধরে তাঁর তীব্র সমালোচনা করেন অভিজিৎ দিপকে। গত মাসে দিলওয়ার বলেছিলেন, ‘তদন্তকারী সংস্থাগুলো হয়তো কিছু অনিয়ম খুঁজে পেয়েছিল এবং পরীক্ষাটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তো এর মধ্যে এমন বড় কোনো ব্যাপার নেই। যেখানেই অনিয়ম পাওয়া যাবে, সরকার তা সংশোধনের জন্য কাজ করবে।’

শিক্ষামন্ত্রীর এ মন্তব্য উগড়ে দিয়ে দিপকে বলেন, ‘আপনার নিজের সন্তানরা যদি এই পরীক্ষা দিত, তাহলেও কি আপনি একই কথা বলতেন? না; কারণ, আপনারা আপনাদের সন্তানদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠান। আমি যুক্তরাষ্ট্রে ছিলাম এবং সেখানে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা ও অন্যান্য দলের সন্তানদের দেখেছি। তাঁরা আমার সঙ্গেই পড়াশোনা করতেন।’

গত বছর রাজস্থানের ঝালাওয়ারে একটি সরকারি স্কুলের ছাদ ধসে সাত শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে দিপকে প্রশ্ন তোলেন, ‘যদি ওই স্কুলে বিজেপির কোনো বিধায়কের (এমএলএ) সন্তান পড়ত, এমনকি বিধায়কের গাড়িচালকের সন্তানও থাকত, তাহলেও কি সেই স্কুলের ছাদ এভাবে ভেঙে পড়ত?’

সমাবেশে সিজেপির প্রধান আরও বলেন, ‘একটি বিষয় নিশ্চিত যে তাঁদের চোখে আপনাদের (সাধারণ শিক্ষার্থী) জীবনের কোনো মূল্য নেই। সে কারণেই (তাঁদের ক্ষেত্রে) ককরোচ (তেলাপোকা) বা প্যারাসাইট (পরজীবী) এর মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল। কারণ, এই লোকেরা মনে করেন যে, তাঁরা চিরকাল ক্ষমতায় থাকবেন...তাঁরা তো নিজেদের মহামানব বলে দাবি করে। আমি মহামানব জি-কে জিজ্ঞাসা করতে চাই, আপনি রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারলেন, অথচ একটা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে পারছেন না?’

বিরোধীদের দেশদ্রোহী তকমা দেওয়ার সমালোচনা

বিরোধীদের দেশদ্রোহী তকমা দেওয়ার সংস্কৃতির সমালোচনা করে দিপকে বলেন, ‘আপনারা আমাকে পাকিস্তানি বলেন। এখানে জড়ো হওয়া সব মানুষকে পাকিস্তানি বলেন। যেসব গণমাধ্যম আপনাদের প্রশ্ন করে, তাদের পাকিস্তানি তকমা দেন। এই দেশের বিরোধী দলকে পাকিস্তানি বলেন। তাহলে আমি জানতে চাই, আসল ভারতীয় কারা? এই আইটি সেলের লোকেরা?’

দিপকে আরও বলেন, ‘হিন্দু-মুসলমান নামে আমাদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে তারা আসল সমস্যাগুলো থেকে আমাদের নজর ঘুরিয়ে দিচ্ছেন...এই সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসংস্থান বা শিক্ষা নয়। সরকারের একমাত্র অগ্রাধিকার হলো হিন্দু-মুসলমানের নামে আপনাদের ভাগ করা।’

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে দিপকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ২০ জুন দিল্লিতে এক অনির্দিষ্টকালের আন্দোলনের ডাক দেন। এ আন্দোলনে শামিল হতে তিনি তাঁর সমর্থকদের বড় সংখ্যায় জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান।