পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর আজ মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশে ছিলেন তাঁর ভাইপো ও তৃণমূলের সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ৫ মে ২০২৬, কলকাতায় এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচনী কৌশল
ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার বিরোধিতায় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাঙালি জাত্যভিমানে বাতাস দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটে জিততে চেয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপি গোটা রাষ্ট্রশক্তিকে এককাট্টা করেছিল, ফলে লড়াইটি ছিল অত্যন্ত কঠিন।
তবু মমতা ভেবেছিলেন, সাংগঠনিক শক্তিতে ভর করে সংখ্যালঘু মুসলমান ও নারীশক্তির ভরসায় তিনি উতরে যাবেন। ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার যাবতীয় ক্ষোভ ‘বাঙালিয়ানা’ নামের কার্পেটের তলায় চাপা দিতে পারবেন বলে মনে করেছিলেন তিনি। বাঙালি অস্মিতা তাঁকে তরিয়ে দেবে বহিরাগতদের ঠেকিয়ে দেওয়ার লড়াইয়ে।
নির্বাচনী ফলাফলের মিরর ইমেজ
অথচ ফল হলো উল্টো। এ যেন ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের ফলাফলের ‘মিরর ইমেজ’। সেবার তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ২০০ আসন, বিজেপি থমকে দাঁড়িয়েছিল ৭৭-এ। এবার মমতা থমকে গেলেন আশির আশপাশে, বিজেপি পেরিয়ে গেল ২০০ আসন। এই পরাজয়ের পর প্রশ্ন উঠেছে, পরাজিত নেত্রী কী করবেন?
মমতার ভবিষ্যৎ: রুখে দাঁড়ানো নাকি সরে যাওয়া?
আহত বাঘিনীর মতো মমতা রুখে দাঁড়াবেন নাকি বয়সের ভারে ভাগ্যকে মেনে নিয়ে সরে যাবেন পাদপ্রদীপের আলো থেকে? বিজেপি যাঁকে এত দিন ‘দিদির ভাতিজা’ বা ‘ভাইপো’ বলে সম্বোধন করে এসেছে, সেই অভিষেকের রাজনৈতিক ভবিষ্যতই বা কী? এই দুটি প্রশ্ন এখন আলোচিত হচ্ছে। সমর্থকেরা অপেক্ষায় রয়েছেন ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার জন্য।
এটা এখন মোটামুটি নিশ্চিত যে রাজ্যে এখনই মাথা তুলে দাঁড়ানো মমতার পক্ষে অসম্ভব। একদিকে বিপুল রায়, অন্যদিকে বিজেপির সর্বভারতীয় শক্তি এবং প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তীক্ষ্ণ নজরদারি রাজ্যে মমতাকে দাবিয়ে রাখবে। তাঁর সামনে বিচরণের একমাত্র আঙিনা হলো সর্বভারতীয় রাজনীতি। সেখানে কোন ভূমিকায় তাঁকে দেখা যাবে, সময়ই তা জানিয়ে দেবে।
কংগ্রেস-তৃণমূল রসায়ন ও দিদি-মোদি সেটিং তত্ত্ব
এই নির্বাচনের আগপর্যন্ত সর্বভারতীয় রাজনীতির বিরোধী পরিসরে মমতার যে অবস্থান ছিল, হারের পর অবশ্যই তাতে বদল ঘটবে। শক্তির দিক থেকে যে অবস্থান থেকে তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত নিতেন, বিরোধী রাজনীতিতে নিজের অভিমত যেভাবে জাহির করতেন, এখন কি তা পারবেন? সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে শ্রদ্ধামিশ্রিত সুসম্পর্ক থাকলেও, মমতা কোনো দিনই নেতা হিসেবে রাহুল গান্ধীকে মেনে নেননি।
বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ গঠনের সময়েও নেতৃত্বের প্রশ্নে মমতা কংগ্রেস নেতা রাহুলের বিরোধিতা করে গেছেন। নীতীশ কুমার যত দিন ‘ইন্ডিয়া’ জোটে ছিলেন, রাহুলের পরিবর্তে তাঁকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। সম্পর্কের রসায়ন এমন ছিল যে রাহুলের ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’কেও তিনি গুরুত্ব দিতে চাননি। সংসদ অধিবেশন চলাকালে বিরোধীদের মধ্যে ফ্লোর কো-অর্ডিনেশনে তৃণমূল সব সময় সম্মত হননি। বারবার চেষ্টা করেছে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে, কংগ্রেস থেকে একটু আলাদা থাকতে।
মমতার এই আচরণ নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির পক্ষে সহায়ক ছিল। মোদি সব সময় চেয়েছেন কংগ্রেসকে দুর্বল রাখতে এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধীরা যাতে জোটবদ্ধ হতে না পারে তা নিশ্চিত করতে। তাঁর দিক থেকে সেটাই ছিল স্বাভাবিক রাজনীতি। কারণ, বিজেপির কাছে সর্বভারতীয় পর্যায়ে এখনো কংগ্রেসই মূল প্রতিপক্ষ। দুর্বল হলেও বিরোধীদের মধ্যে তারাই একমাত্র দল, যার সর্বভারতীয় উপস্থিতি রয়েছে। সেই দলকে নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখতে পারলে বিজেপির লাভ। মমতা তাঁদের সেই চাহিদা বারবার পূরণ করে এসেছেন।
বিভিন্ন রাজ্যে প্রার্থী দিয়ে কংগ্রেসের ভোটে ভাগ বসানো ছাড়াও প্রকাশ্যে রাহুলের নেতৃত্ব ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মমতা। মোদিও নানা বিষয়ে মমতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুর্নীতির’ বিরুদ্ধে তদন্ত হলেও, তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বারবার জেরা করলেও, কেন কাউকে ইডি বা সিবিআই এখনো গ্রেপ্তার করেনি, জনতার পাশাপাশি বিভিন্ন দলের নেতারা বারবার সে প্রশ্ন তুলেছেন।
এ থেকেই জন্ম ‘দিদি-মোদি সেটিং’ তত্ত্ব। রাজনৈতিক মহলে এই তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা ও জল্পনার অন্ত ছিল না। কানাকানি হতো, ‘রাজ্যে দিদি-মোদির কুস্তিটা নকল, কেন্দ্রে দুজনের দোস্তিটা আসল।’ দিল্লি গিয়ে মোদির সঙ্গে মমতা একা দেখা করতেন। একবার হলুদ গোলাপগুচ্ছ নিয়ে দেখা করার ছবি ছাপা হওয়ার পর ছড়াকারেরা ছড়া বেঁধেছিলেন, ‘রাজ্যে কুস্তি, কেন্দ্রে দোস্তি’। এমন যুক্তি শোনা যেত, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াই যখন মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, তখন মমতাকে পশ্চিমবঙ্গে সন্তুষ্ট রেখে তাঁকে দিয়ে কেন্দ্রীয় স্তরে বিরোধীদের ছাড়া-ছাড়া রাখাটাই বিচক্ষণের রাজনীতি।
এবারের ভোটের ফল সেই তত্ত্ব পুরোপুরি নস্যাৎ করে দিল। সেই সঙ্গে তুলে দিল মমতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা। গত সোমবার ভোটের ফল নিশ্চিত হওয়ার পর রাহুল ফোন করেছিলেন মমতাকে। মমতার ‘১০০ আসনে ভোট চুরির’ অভিযোগকে রাহুল সমর্থন করেছেন। রাহুল অবশ্যই চাইবেন শর্তহীন মমতাকে ‘ইন্ডিয়া’ জোটে বেশি করে শামিল করতে। রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকতে পরাস্ত ও বিপর্যস্ত মমতারও হয়তো এ ছাড়া অন্য উপায় নেই।
অভিষেকের ভবিষ্যৎ
ভারতের পরিবারতন্ত্র রাজনীতির নিয়ম মেনে অভিষেকও অঘোষিতভাবে তৃণমূল রাজনীতির ‘নাম্বার টু’ হয়ে গেছেন। ২০১১ সালে মমতা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ধীরে ধীরে দলীয় রাজনীতিতে তাঁর উত্থান। ক্রমেই তিনি হয়ে ওঠেন দলের সমান্তরাল ‘পাওয়ার সেন্টার’। দলীয় কার্যালয়ে কদাচিৎ সময় কাটান অভিষেক। কলকাতার ক্যামাক স্ট্রিটে নিজের কার্যালয় খুলে সেখান থেকে দল পরিচালনা করেন করপোরেট কায়দায়।
একসময় মমতা যাঁকে নিয়ে এসেছিলেন ভোটকুশলী হিসেবে, সেই প্রশান্ত কিশোরের বিদায়ের পর তাঁরই তৈরি ‘আইপ্যাক’ এখন চলে অভিষেকের নির্দেশে। দলে অসন্তোষ ও বিতর্কের সূত্রপাতও সেটা। অভিষেক বরাবরই চেয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে, নতুনদের হাতে বেশি ক্ষমতা দিতে। এ উদ্যোগ মমতার সঙ্গে তাঁর দূরত্ব সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল একটা সময়। নতুনদের এগিয়ে দিতে গেলে পুরোনোদের সরিয়ে দিতে হয়। তা করতে গিয়ে সংঘাতের জন্ম।
সৌগত রায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, মুকুল রায়, সুব্রত বক্সি, ফিরহাদ (ববি) হাকিম, অরূপ রায়, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়রা অসন্তুষ্ট হয়ে মমতার শরণাপন্ন হয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। যাঁদের নিয়ে আন্দোলন করে মমতা দলটাকে গড়ে তুলেছেন, তাঁদের প্রতি অভিষেকের অনীহা দলেও একটা সময় সংকট সৃষ্টি করেছিল। কিছুদিন দল থেকে সরেও দাঁড়িয়েছিলেন অভিষেক।
প্রথমে মুকুল, পরে শুভেন্দু অধিকারী ও সৌমিত্র খাঁর মতো নেতারা দলত্যাগ করে বিজেপিতে চলে যান। পুরোনো ও নতুনের সংঘাতের প্রতিফলন দলের শৃঙ্খলা তছনছ করে দেয়। ক্ষমতার দুই অক্ষের টানাপোড়েনে অসহায় বোধ করতে থাকেন সাধারণ কর্মী ও নেতারা। বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় সর্বস্তরে।
গত কয়েক বছরে, বিশেষ করে ২০২১ সালের ভোটে জেতার পর একাধিক সাংগঠনিক প্রশ্নে মমতার সঙ্গে অভিষেকের মতপার্থক্য দেখা গেছে। অবস্থা এমন হয়েছিল, ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে অভিষেক নিজেকে নির্বাচন থেকে সরিয়েও নিয়েছিলেন। জয়ের পর মমতাই তাঁকে ফিরিয়ে আনেন। তাঁর হস্তক্ষেপে শান্তি স্বস্ত্যয়ন হলেও অসন্তোষ তুষের আগুনের মতো ধিকি ধিকি জ্বলতেই থেকেছে।
এবারের ভোটে প্রার্থী তালিকায় অভিষেকের ছাপ ছিল স্পষ্ট। পুরোনো ৭৪ জন বিধায়ককে মনোনয়ন না দেওয়াই শুধু নয়, জেলায় জেলায় প্রবীণদের সরিয়ে নবীনদের তিনি সামনে এনেছেন। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারলেন না। মমতার বয়স এখন ৭১। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দলকে নতুন করে গড়ে তোলার ক্ষমতা হয়তো তাঁর নেই। সেই দায়িত্ব অভিষেক কি পালন করতে পারবেন? পারলে কীভাবে? এটাও বড় আগ্রহের বিষয়।
তৃণমূল কংগ্রেস ও আইপ্যাক
অভিষেকের জন্যই পাঁচ বছর ধরে আইপ্যাক হয়ে উঠেছিল দলের চোখ ও কান। আইপ্যাকের সিদ্ধান্তই হয়ে দাঁড়িয়েছিল চূড়ান্ত। ভোটের প্রচার পর্বে এই সংস্থার অফিস ও কর্তার বাড়িতে ইডি তল্লাশি করতে গিয়েছিল। সেখানে হাজির হয়ে মমতা ছিনিয়ে নিয়ে এসেছিলেন দরকারি কাগজপত্র ও ল্যাপটপ। গ্রেপ্তারও হন সংস্থার এক বড় কর্তা। তারপরই তারা জানায়, রাজ্যের সব কাজ তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখছে।
ভোট-বিপর্যয়ের পর তৃণমূল নেতৃত্ব যাবতীয় সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত আগের মতো আইপ্যাকের হাতে তুলে দেয় কি না, কিংবা আইপ্যাকও আবার আগের মতো তৃণমূলের সঙ্গে কাজ করে কি না, সেটা দেখার বিষয়। এই সংস্থার ৪১ হাজার কর্মীর হাতেই ছিল দলের কৌশল স্থির করা ও তা বাস্তবায়নের ভার। ভাষ্যনির্মাণ, প্রচারকৌশল ও স্লোগান সৃষ্টির ভার, এমনকি কোন আসনের প্রার্থী হওয়ার উপযুক্ত কে, কোন নেতা কোথায় কী ধরনের ভাষণ দেবেন, সবকিছু আইপ্যাক ঠিক করে দিত। ফলে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। বিচ্ছিন্ন হয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের যোগসূত্র। বারবার জানিয়েও কোনো প্রতিকার হয়নি।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তৃণমূলের সঙ্গে আইপ্যাকের সম্পর্ক কেমন থাকে, সেটাও এক বড় প্রশ্ন। মমতা ও অভিষেকের মতো আইপ্যাকের ভবিষ্যৎও এখন আতশি কাচের তলায়।



